গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালের কোমল সুবাস চারপাশ ভরিয়ে তোলে কাঠগোলাপ ফুল। মৃদু ঘ্রাণ, দৃষ্টিনন্দন পাপড়ি ও মুগ্ধকর সৌন্দর্যে ভরপুর এই ফুল সাধারণত ৮ থেকে ১০ মিটার উঁচু গাছে ফোটে। তবে রংপুরের পীরগাছা উপজেলার ইটাকুমারী জমিদারবাড়ির প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে থাকা একটি কাঠগোলাপ গাছ সেই সীমা বহু আগেই ছাড়িয়ে গেছে। আড়াইশ বছরেরও বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকা এই বিশাল গাছটি শুধু একটি বৃক্ষ নয়; এটি এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের জীবন্ত সাক্ষী।
ইটাকুমারীর জমিদারবাড়ির পশ্চিম দিকে বিশাল কাণ্ড ও বিস্তৃত শাখাপ্রশাখা মেলে গাছটি দাঁড়িয়ে আছে। এখনও নিয়মিতভাবে ফুল ফোটে এতে—সাদা ও হালকা হলুদ মিশ্রণে ফুল যেন ইতিহাসের পাতায় ছোঁয়া দেয়। কাঠগোলাপের বিচিত্র রূপ যেমন দৃষ্টিনন্দন, তেমনি এর সুবাসও দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে। কিছু ফুল দুধসাদা, কিছুতে হালকা হলুদের ছোঁয়া, আবার কিছুতে লালচে গোলাপি আভা দেখা যায়।
দক্ষিণ ভারত, মেক্সিকো, মধ্য আমেরিকা ও ভেনেজুয়েলায় কাঠগোলাপের উৎপত্তি হলেও বাংলাদেশেও এটি পরিচিত শোভা বৃদ্ধিকারী গাছ। স্থানীয়ভাবে একে গুলাচি, গোলাইচ, গোলকচাঁপা বা চালতাগোলাপ নামেও ডাকা হয়। তবে ইটাকুমারীর কাঠগোলাপ শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; এটি দীর্ঘ ইতিহাসের অংশ। ইটাকুমারীর কাঠগোলাপ আজও রাজা শিবচন্দ্র রায়ের স্মৃতি বহন করছে।
সময়, ঝড়-বৃষ্টি ও প্রজন্মের পালাবদল সত্ত্বেও গাছটি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, যেন জানিয়ে দিচ্ছে—ঐতিহ্য মুছে যায় না, টিকে থাকে সময়ের বুক জুড়ে।
৭৮ বছর বয়সী স্থানীয় প্রবীণ অমরেশ চন্দ্র রায় বলেন, “আমি ছোটবেলা থেকেই এই গাছটিকে এমন বড় দেখেছি। আমার বাবা বলতেন, তাঁর দাদারও জন্মের আগেই গাছটি ছিল। এই গাছের নিচে জমিদার সাহেবরা পিঁড়ি পেতে বসতেন, দরবার হতো এখানে। এখনো গাছটা দেখলে মনে হয় সময় থমকে গেছে।
৮২ বছর বয়সী হরিলাল রবিদাস বলেন, “এই কাঠগোলাপের ফুল একসময় পূজার কাজে ব্যবহার হতো। বর্ষার সকালে যখন ফুল ঝরে পড়ত, তখন পুরো আঙিনা সুবাসে ভরে যেত। আজও সেই গন্ধ যেন একই রকম।”
ইটাকুমারী শিবচন্দ্র রায় কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও আন্দোলনের নেতা নজরুল ইসলাম হক্কানী বলেন, “অষ্টাদশ শতকের আগে কোচবিহার থেকে রাজা শিবচন্দ্র রায়ের পূর্বপুরুষরা এখানে জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। রাজা শিবচন্দ্রই এই কাঠগোলাপ গাছটি রোপণ করেছিলেন। তখন থেকেই এটি জমিদারবাড়ির ঐতিহ্যের অংশ।”
তিনি আরও জানান, ১৭৮৩ সালে ব্রিটিশবিরোধী প্রজা বিদ্রোহের সময় রাজা শিবচন্দ্র প্রজাদের পক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেই আন্দোলনের ইতিহাস, জমিদারবাড়ির স্থাপত্য এবং এই কাঠগোলাপ গাছ—সবই একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে।
হক্কানী জানান, জমিদারবাড়িটি মোগল ও আধুনিক স্থাপত্যের সংমিশ্রণে নির্মিত হয়েছিল। বর্তমানে এটি ধ্বংসপ্রায়, তবে কাঠগোলাপ গাছটি এখনো সগৌরবে টিকে আছে। এত উঁচু ও পুরোনো কাঠগোলাপ গাছ বাংলাদেশে বিরল। গাছের কাণ্ড, পাতা ও ফুল একসময় আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরিতেও ব্যবহার হতো।
ইতিহাসপ্রেমী ও প্রকৃতিপ্রেমীরা দূরদূরান্ত থেকে গাছটি দেখতে আসেন। কেউ বলেন, গাছটির সামনে দাঁড়ালে মনে হয় সময় থমকে গেছে—জমিদার যুগের স্মৃতি এখনও বাতাসে ভাসে।
রংপুর বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন বলেন, “আমার জানা মতে, এটি দেশের সর্ববৃহৎ কাঠগোলাপ গাছ। আমি একাধিকবার গাছটি পরিদর্শন করেছি। ধারণা করা হচ্ছে, এর বয়স আড়াইশ বছরেরও বেশি।” তিনি আরও বলেন, “এটি শুধু একটি গাছ নয়; এটি একটি জীবন্ত ঐতিহাসিক দলিল। সরকারি উদ্যোগে গাছ ও জমিদারবাড়ির ধ্বংসপ্রায় স্থাপনা সংরক্ষণ জরুরি। এতে স্থানীয় পর্যটন ও ঐতিহ্য উভয়ই সমুন্নত থাকবে।”
প্রধান সম্পাদক ঃ আবুবকর সিদ্দিক সুমন , নির্বাহী সম্পাদকঃ রুবেল হাসনাইন , বার্তা সম্পাদক ঃ মিসবাহ উদ্দিন
গুলশান, ঢাকা-১২১৬, বাংলাদেশ। ইমেইলঃ admin@sylhet21.com,sylhet21.com@gmail.com মোবাইলঃ +1586 665 4225