সরাসরি রেডিও সম্প্রচার সরাসরি ভিডিও সম্প্রচার
০৩:৪৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬

কাগজে উন্নয়ন, বাস্তবে দুর্ভোগ—১৭ বছরে বিয়ানীবাজারে কয়েকশ’ কোটি টাকার প্রকল্প

স্টাফ রিপোর্টার:
  • আপডেট সময়ঃ ০১:২০:৪৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২৬
  • / ৬১ বার পড়া হয়েছে।

মুড়িয়া ইউনিয়নের বড়দেশ গ্রামে নির্মিত এই সেতুর সংযোগ সড়ক নেই। অথচ এটি নির্মানে ব্যয় হয়েছে কোটি টাকার উপরে। এরকম বহু প্রকল্প পরিকল্পনার অভাবে জলে গেছে-ছবি: সংগৃহীত/

উন্নয়নের ঘোষণা ছিল জোরালো। প্রকল্পের সংখ্যাও কম নয়। কোথাও সড়ক, কোথাও ড্রেন, কোথাও নদীভাঙন রোধ। গত ১৭ বছরে বিয়ানীবাজারে উন্নয়নের নামে সরকারি খাতে খরচ হয়েছে কয়েকশ’ কোটি টাকা। কিন্তু এত ব্যয়ের পরও নাগরিক জীবনমানের সূচকে বিয়ানীবাজার আজও পিছিয়ে। শহর থেকে গ্রাম সবখানেই দুর্ভোগ নিত্যসঙ্গী।

সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের বিশ্লেষণে মিলেছে এসব তথ্য। দেখা যায়- উন্নয়নের বড় অংশই সীমাবদ্ধ ছিল কাগজে, রিপোর্টে আর উদ্বোধনী ফলকে। বাস্তবে এসব কাজের কোনোটাই টেকসই হয়নি।

বিভিন্ন প্রকল্প বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১৭ বছরে বিয়ানীবাজার পৌরশহর ও উপজেলা এলাকায় উন্নয়ন খাতে ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ গেছে সড়ক ও যোগাযোগ খাতে। আঞ্চলিক মহাসড়ক, শহরের প্রধান সড়ক, গ্রামীণ সড়ক ও ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ ও সংস্কারে ব্যয় করা হয়েছে কোটি কোটি টাকা। কিন্তু একই সড়কে বারবার সংস্কার, নিম্নমানের কাজ এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এই বিপুল ব্যয়ের সুফল টেকসই হয়নি।

পৌরসভার আওতায় ড্রেনেজ, সড়ক কার্পেটিং, ফুটপাত, স্ট্রিটলাইট ও বাজার অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় শ’ত কোটি টাকার উপরে। কাগজে এসব প্রকল্পে শহরের চেহারা বদলানোর কথা থাকলেও বাস্তবে বর্ষা এলেই বিয়ানীবাজারের বড় অংশ জলাবদ্ধতায় ডুবে যায়, অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকে প্রতিটি সড়ক। যা এই ব্যয়ের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

নদীভাঙন রোধ ও নদীশাসন খাতে ব্যয় হয়েছে আরও বড় অঙ্ক। সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর তীর সংরক্ষণ, জিওব্যাগ ফেলা, কংক্রিট ব্লক বসানো এবং নদী খননের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের উন্নয়ন করা হয়েছে। অথচ প্রতিবছর নতুন নতুন এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে, ভিটেমাটি হারাচ্ছে শ’ত-শ’ত পরিবার।

শিক্ষা অবকাঠামো খাতে ভবন বেড়েছে কিন্তু শিক্ষক সংকট, শ্রেণিকক্ষের মান এবং শিক্ষার গুণগত উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।

স্বাস্থ্য খাতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জনবল ঘাটতি, যন্ত্রপাতির অচলাবস্থা ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় সাধারণ মানুষ প্রত্যাশিত সেবা পাচ্ছে না।

স্যানিটেশন প্রকল্পে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতায় পানি শোধনাগার, পাইপলাইন ও নলকূপ স্থাপনে ব্যয় হলেও ফল পাওয়া যাচ্ছেনা। এছাড়া আশ্রয়ণ, বাজার উন্নয়ন, খাল খনন, কৃষি অবকাঠামো ও অন্যান্য সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় করা অর্থের সঠিক ব্যবহার হয়নি।

জাতীয় বাজেট বই ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি), পৌরসভার অনুমোদিত প্রকল্প তালিকা, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকল্পের তথ্য, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নদীভাঙন ও নদীশাসন সংক্রান্ত প্রকল্প নথি, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পানি ও স্যানিটেশন প্রকল্পের হিসাব, পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন উপজেলা পর্যায়ের অবকাঠামো প্রকল্পের বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে মিলেছে এসব তথ্য।

বিয়ানীবাজার পৌরশহরসহ উপজেলার বিভিন্ন সড়ক গত এক দশকে একাধিকবার উন্নয়ন ও সংস্কার প্রকল্পের আওতায় এসেছে। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং পৌরসভার নথি অনুযায়ী কোনো কোনো সড়কে তিন বছরের মধ্যে দুইবার কার্পেটিং ও ওভারলে কাজ দেখানো হয়েছে। প্রকল্প শেষে ঠিকাদারি বিল পরিশোধও হয়েছে নিয়মমাফিক। কিন্তু বর্ষা মৌসুম এলেই এসব সড়ক ভেঙে পড়ে, সৃষ্টি হয় বড় বড় খানাখন্দ। ফলে যানবাহন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, বাড়ে দুর্ঘটনা ও যানজট।

পৌরশহরের বাইরেও চিত্রও একই। এলজিইডির আওতায় গ্রামীণ সড়ক ও ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণে বড় অংকের ব্যয় হলেও বহু সড়ক বর্ষা এলেই চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে।

উপজেলার তিলপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হোসেন আহমদ বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ঠিকাদারি সিন্ডিকেট, লাইসেন্স ভাড়া দিয়ে কাজ বিক্রি এবং নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের প্রবণতা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের কাজ বাস্তবে করেন সাব-কন্ট্রাক্টররা, যাদের ওপর কার্যকর নজরদারি নেই। ফলে কাজের মান নিশ্চিত না করেই প্রকল্প সমাপ্ত দেখানো হয়।

ড্রেনেজ উন্নয়নের নামে বিয়ানীবাজার পৌর এলাকায় উল্লেখযোগ্য ব্যয় হয়। নতুন ড্রেন নির্মাণ, পুরোনো ড্রেন সংস্কার সবই হয়েছে কাগজে। বাস্তবে বর্ষা এলেই শহরের বড় অংশ পানির নিচে চলে যায়। পৌরসভার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অনেক জায়গায় ড্রেন বানানো হয়েছে, কিন্তু আউটলেট নেই। কোথাও আবার দখলের কারণে পানি নামতে পারে না।

পৌর শহরের বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম বলেন, আমরা প্রথম শ্রেণির পৌরসভার কর দিই। কিন্তু সুযোগ সুবিধা পাই তৃতীয় শ্রেণির।

উন্নয়ন ব্যয়ের সবচেয়ে বড় ও বিতর্কিত খাত হয়ে উঠেছে নদীভাঙন রোধ প্রকল্প। এসব প্রকল্পে জিওব্যাগ ফেলা, কংক্রিট ব্লক বসানো, বাঁধ নির্মাণ, নদী খনন ও পুনঃখননের মতো কাজ দেখানো হলেও বাস্তবে প্রতিবছর বর্ষা এলেই ভাঙন বাড়ে। নতুন নতুন এলাকা গ্রাস হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বর্ষা শুরুর আগেই কাজ শেষ দেখিয়ে বিল তোলা হয়। আর বর্ষা নামলেই জিওব্যাগ সরে যায়, কংক্রিট ব্লক ভেঙে পড়ে নদীগর্ভে। এসব প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক এক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখানে প্রকৃত অর্থে নদী শাসন হয়নি, হয়েছে বরাদ্দ শাসন।

বিয়ানীবাজার উপজেলায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খরচ হয়েছে। এই সময়ে উপজেলায় শতাধিক প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজ ভবন নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছে। ব্যয় হয়েছে প্রায় কমপক্ষে ২শ’ কোটি টাকা। নতুন ভবন, বহুতল একাডেমিক ব্লক আর নামমাত্র ডিজিটাল সুবিধা যোগ হলেও শিক্ষার মান, শিক্ষক সংকট ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা রয়ে গেছে আগের জায়গাতেই। অনেক প্রতিষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই, আবার কোথাও ছাত্রসংখ্যার তুলনায় শিক্ষকের সংখ্যা অপ্রতুল। ফলে অবকাঠামো থাকলেও শিক্ষা কার্যক্রম প্রত্যাশিত মানে পৌঁছাতে পারেনি।

বিয়ানীবাজার প্রেসক্লাবের সভাপতি সজীব ভট্রাচার্য বলেন, পরিকল্পনাহীন প্রকল্প, রাজনৈতিক প্রভাব আর স্বল্পমেয়াদি অবকাঠামোকেন্দ্রিক উন্নয়ন এখানকার দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনাকে নষ্ট করেছে। অবকাঠামো দাঁড়ালেও মানুষের ভরসা ও ভবিষ্যৎ দাঁড়ায়নি এই বাস্তবতা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

শিক্ষাবিদ আলী আহমদ বলেন, সমস্যাটা কোনো একক প্রকল্পে নয় বরং পুরো পরিকল্পনা কাঠামোয়। বিয়ানীবাজারের উন্নয়ন কার্যক্রমে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব ছিল স্পষ্ট। একই জায়গায় বারবার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, কিন্তু কাজের মান যাচাই ও পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণে ছিল মারাত্মক ঘাটতি। সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে জবাবদিহির অনুপস্থিতি।

নিউজটি শেয়ার করুন

বিস্তারিত লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন