এক জীবনের স্মৃতি বুকে নিয়ে আজ শূন্য ফিরোজা
ফিরোজা আজ শূন্য, দেশের আকাশ ভারী

- আপডেট সময়ঃ ১০:২৫:০৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩ জানুয়ারী ২০২৬
- / ১১৪ বার পড়া হয়েছে।

রাজধানীর গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’ আজ গভীর শোক আর নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন। সবকিছু আগের মতোই আছে, বাড়ির আসবাব, বাগান, প্রহরীদের ছাউনি। শুধু নেই সেই প্রিয় মানুষটি। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া-এর প্রয়াণে পুরো বাড়িটাই যেন শূন্য হয়ে পড়েছে।
গুলশানের ফিরোজার সামনে গিয়ে দেখা যায় বেদনাবিধুর পরিবেশ। নিরাপত্তা কর্মীদের চোখেমুখে বিষণ্নতা, বুকজুড়ে কালো ব্যাজ। এক প্রহরী অশ্রুসজল কণ্ঠে বলেন, ম্যাডাম সবসময় আমাদের খোঁজ নিতেন। ঠিকমতো খেয়েছি কি না জিজ্ঞেস করতেন। আজ তিনি নেই, বাড়িটাও যেন নিঃশ্বাসহীন।
ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল রোডে যে বাড়িতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি হিসেবে বসবাস করেছিলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর সেটিই ছিল খালেদা জিয়ার ঠিকানা। তবে এক-এগারোর পর রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সেখান থেকে উচ্ছেদের পর গুলশানের ‘ফিরোজা’ই হয়ে ওঠে তার স্থায়ী নিবাস। এখান থেকেই ২০১৮ সালে পুরনো ঢাকার আদালতে গিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলার রায়ে তাকে কারাগারে যেতে হয়। পরে করোনা মহামারির সময় বিশেষ শর্তে মুক্তি পেয়ে হাসপাতাল থেকে তিনি আবার ফিরোজায় ফেরেন।
বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, এই বাড়ির প্রতিটি কোণে ম্যাডামের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। চার দশকের বেশি সময় যারা উনার পাশে ছায়ার মতো ছিলেন, তাদের কষ্ট ভাষায় প্রকাশের নয়। ফিরোজার পরতে পরতে আজও যেন তার উপস্থিতি অনুভূত হয়।
চেয়ারপারসনের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনী (সিএসএফ)-এর এক সদস্য বলেন, দীর্ঘদিন ম্যাডামের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলাম। আজ প্রিয় মানুষটি নেই। বাড়ির ভেতরে পা রাখলেই শূন্যতা আর নিস্তব্ধতা আমাদের গ্রাস করে। আল্লাহর কাছে শুধু দোয়া করি, তিনি যেন ম্যাডামকে শান্তিতে রাখেন।
ফিরোজার পাশের ১৯৬ নম্বর বাড়িটি ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তার পরিবারের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। সম্প্রতি সেই বাড়ির দলিল খালেদা জিয়ার হাতে তুলে দেওয়া হয়। বর্তমানে সেখানে অবস্থান করছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। মায়ের মৃত্যুর পর তিনি দিনভর ইবাদত, কোরআন তিলাওয়াত ও দোয়ার মাধ্যমে সময় কাটাচ্ছেন। আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে মায়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বারবার আবেগে ভেঙে পড়ছেন তিনি।
গুলশান এলাকা কূটনৈতিক জোন হওয়ায় সাধারণ জমায়েত সীমিত থাকলেও অনেক বাসিন্দাকে নীরবে শোক জানাতে ফিরোজার সামনে আসতে দেখা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দা হাসানুজ্জামান খান বলেন, ম্যাডাম নেই, এখন ভরসার জায়গায় আছেন তারেক রহমান। এই শোক শুধু তার পরিবারের নয়, গণতন্ত্রপ্রিয় সবার।
এদিকে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়েও বইছে শোকের ছায়া। কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন এবং দলীয় ও জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে। সেখানে খোলা হয়েছে শোক বই। শোক বইতে স্বাক্ষর করেছেন সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমীন এস মুর্শিদ, যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জেকবসন, ইরানের রাষ্ট্রদূত মনসুর চাভুশি, ছারছীনা দরবার শরীফের পীর মাওলানা শাহ আবু নছর নেছার উদ্দিন আহমেদ এবং জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারি।
কার্যালয়ের সামনে নেতা-কর্মী ও গণমাধ্যমকর্মীদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। শোক বইতে স্বাক্ষরের জন্য নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। নেতাকর্মীরা বলছেন, চেয়ারপারসনের প্রয়াণে তারা গভীরভাবে শোকাহত। তবে তাদের বিশ্বাস, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ম্যাডামের জনপ্রিয়তার ইতিহাস কেউ অতিক্রম করতে পারবে না।
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার ভোরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেন। বুধবার মানিক মিয়া এভিনিউতে জানাজা শেষে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জিয়া উদ্যান-এ শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে সমাহিত করা হয়।


















