সরাসরি রেডিও সম্প্রচার সরাসরি ভিডিও সম্প্রচার
০৭:২১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রাজনীতির মাঠে এ-আ-ই ক-ন-টে-ন্ট উ-ত্তা-প

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময়ঃ ০৬:৪৪:৫৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / ৪০ বার পড়া হয়েছে।

নির্বাচনের বাকি আর আট দিন। সময় যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স – সংক্ষেপে এআই) মাধ্যমে তৈরি সত্যের আদলে মিথ্যার কল্পকাহিনি। এআইয়ের বহুমুখী ব্যবহারও রাজনৈতিক মাঠে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। বিশেষ করে শীর্ষ নেতাদের নামে তৈরি করা ডিপফেক ভিডিও, ভয়েস ক্লোনিং এবং ভুয়া ফটোকার্ডের মাধ্যমে অপপ্রচার মোকাবিলায় এখন বাড়তি সতর্কতায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। মূলত প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ করে জনমনে বিভ্রান্তি দূর করাই এখন দল দুটির বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দল দুটি বলছে, এআই বা গুজব প্রতিরোধে সরকারি কোনো আইন নেই। এ জন্য অনেকে রক্ষা পেয়ে যাচ্ছে। তাই সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) গুজব প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের পরামর্শ, দলগুলোকে এই ‘ডিজিটাল যুদ্ধ’ সামাল দিতে কেবল পাল্টা প্রচার নয়, বরং ফ্যাক্ট-চেকিং সেল গঠন, আইটি উইংয়ের নজরদারি এবং কর্মীদের ডিজিটাল লিটারেসি বাড়াতে হবে। তাদের মতে, নির্বাচন সামনে রেখে ছড়ানো ভুয়া তথ্যগুলোর নেতিবাচক প্রভাবের শিকার হচ্ছেন মূলত রাজনৈতিক দল ও নেতারাই।

সম্প্রতি এআই দিয়ে তৈরি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ওই ভিডিওতে দেখা গেছে, বিএনপি চেয়ারম্যান নতুন ফেসবুক পেজ খুলে সবাইকে ফলো করার আহ্বান জানাচ্ছেন। কিন্তু ভিডিওটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তারেক রহমানের পুরোনো একটি ভিডিওর বিভিন্ন দৃশ্য ব্যবহার করে এআইয়ের মাধ্যমে ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে। গত ২০ জানুয়ারি ডেইলি ডিইউসিএসইউ ফেসবুক থেকে তারেক রহমানের নামে এআই জেনারেটেড আরেকটি ভুয়া ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে লেখা ছিল–মেট্রোরেলে খরচ বেশি, ক্ষমতায় এলে জনগণের সুবিধার্থে মেট্রোরেল বন্ধ করে দিয়ে ডিজিটাল লোকাল বাস চালু করব।

গত ৩০ জানুয়ারি রাতে এআই জেনারেটেড বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে কথিত ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ কর্মকর্তা গৌরব দোররার সঙ্গে বৈঠকের চারটি ছবি প্রকাশ করা হয়। এআই দিয়ে বানানো ছবিতে আমীর খসরুর সঙ্গে দলের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু ও যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবিরকে দেখানো হয়েছে। মুহূর্তে ছবিগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। পরে ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার জানায়, সাক্ষাতের ভাইরাল হওয়া চারটি ছবিই ভুয়া।

শুধু উপরোক্ত এই তিনটি উদাহরণ নয়। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান, দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসসহ দলের নেতাদের মুখমণ্ডল ব্যবহার করে এআই দিয়ে তৈরি নেতিবাচক অজস্র ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বা হয়েছে। নির্বাচন ঘিরে আগামী কয়েক দিনে এই প্রবণতা বাড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই কনটেন্ট বা গুজব নিয়ে দলের আইটি সেল কাজ করছে। ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, আমাদের সত্য ও ন্যায়ের পথে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। মিথ্যা প্রোপাগান্ডা বা অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সতর্ক থেকে বিএনপির পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

দলের স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ও বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান বলেন, ‘এআইয়ের মাধ্যমে বিএনপির বিরুদ্ধে অনেক গুজব ছড়ানো হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে একটি গ্রুপ এসব করছে। গুজব প্রতিরোধে দলের আইটি বিভাগ কাজ করছে। মিথ্যা অপতথ্য দেখে নেতা-কর্মীদের বিভ্রান্ত না হতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

রিউমর স্ক্যানার, ফ্যাক্ট ওয়াচ, ডিসমিসল্যাব, বাংলা ফ্যাক্ট ও দ্য ডিসেন্টের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফেসবুকে গত সাত দিনে নির্বাচন ঘিরে ৯৩টি ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে সর্বোচ্চ ২৯টি রয়েছে। এআই দিয়ে তৈরি অন্তত ২২টি ছবি-ভিডিও এবং ২টি ডিপফেক ভিডিও শনাক্ত হয়েছে। গত জানুয়ারিতে তারেক রহমানকে জড়িয়ে একক ব্যক্তি হিসেবে সর্বোচ্চ ৬০টি অপতথ্য (নেতিবাচক) প্রচার করা হয়েছে। ওই সময়ে বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠন নিয়ে ২৩৮টি ভুল তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

বিএনপির সূত্রমতে, দলের শীর্ষ নেতাদের নামে ছড়ানো ফেক ছবি বা ভিডিও সম্পর্কে বিএনপি তাৎক্ষণিকভাবে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এগুলোকে ‘বানোয়াট ও ভিত্তিহীন’ বলে জনগণকে সচেতন করেছে। এ ছাড়া বিএনপির মিডিয়া সেলের ফেসবুক পেজেও তা পোস্ট দেওয়া হচ্ছে। দলের আইটি উইংয়ের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত এআই কনটেন্টগুলো শনাক্ত করা এবং সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মে রিপোর্ট করার প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়েছে।

বিএনপির তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, দলের আইটি সেল ফ্যাক্ট চেক করে ভুয়া কনটেন্টগুলো শনাক্ত করছে এবং রিপোর্ট করছে। তিনি বলেন, এআই দিয়ে কিছু কনটেন্ট এমন বানানো হয় যে তা সত্য না মিথ্যা, বোঝা খুবই কঠিন। এতে মানুষ বিভ্রান্তি হচ্ছেন। ভুয়া তথ্য থেকে নেতা-কর্মীদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা রয়েছে।

অপতথ্য মোকাবিলায় প্রস্তুত জামায়াত

রিউমর স্ক্যানারের তথ্যমতে, গত জানুয়ারিতে জামায়াতে ইসলামী, দলের অঙ্গসংগঠন এবং নেতা-কর্মীদের নামে ২৩৮টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে। এর মধ্যে দল হিসেবে জামায়াতকে জড়িয়ে ১৫৩টি ও ছাত্রশিবিরের নামে ২০টি অপতথ্য প্রচার করা হয়। একই সময়ে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমানকে জড়িয়ে ২৫টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। গত সপ্তাহে জামায়াতের আমির সাতটি ভুয়া তথ্যের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ‘তারেক রহমান ঝগড়া করতে এলে ছাত্রী সংস্থার কর্মীরা যথেষ্ট’–এমন একটি ভুয়া ফটোকার্ড ছড়ানো হয়।

দলীয় একটি সূত্র জানায়, জামায়াত তাদের শীর্ষ নেতাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলোর সুরক্ষা বাড়িয়েছে। সম্প্রতি জামায়াতের আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাকসহ বিভিন্ন সাইবার আক্রমণের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। এআই কনটেন্ট বা গুজব শনাক্তে দলীয় আইটি সেল বিশেষভাবে কাজ করছে। তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার শনাক্ত করার বিষয়ে প্রশিক্ষণও দিচ্ছে আইটি সেল। এ ছাড়া এআইয়ের মাধ্যমে দল ও নেতা-কর্মীদের সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো প্রতিরোধে তারা নির্বাচন কমিশনের সরাসরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছে।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটা দল কী করবে? গুজব প্রতিরোধে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে কাজ করতে হবে। এ বিষয়ে এখনো কোনো কার্যকরী আইন করেনি। এ জন্য প্রযুক্তির এসব টুলস ব্যবহার করে সবাই রক্ষা পেয়ে যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, মিথ্যা তথ্য থেকে রক্ষা পেতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। এআই রিলেটেড অনেক অপকর্ম হচ্ছে। দেশের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে এটা সামাল দিতে হবে।

যা বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা

নির্বাচনকে ঘিরে প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও প্রার্থীকে টার্গেট করে মিথ্যা তথ্যসংবলিত কনটেন্ট প্রচার আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, দেশের অগ্রসর জনগোষ্ঠীর একটি অংশের মধ্যে এআই সম্পর্কে ধারণা থাকলেও অধিকাংশ মানুষের তা নেই। নির্বাচনের সময় গ্রামগঞ্জে এসব ফেক কনটেন্ট কী প্রভাব ফেলবে, তা এখনই বলা কঠিন।

রাজনীতি বিশ্লেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘নির্বাচন সামনে রেখে এই ধরনের কটূক্তি আরও বাড়তে পারে। এদের থামানো যাবে বলে মনে করছি না। এআই ফেক কনটেন্ট সম্পর্কে সচেতনতামূলক প্রচার বাড়াতে হবে।’

করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মিডিয়া সেন্টার যারা চালান, তাদের ফ্যাক্ট-চেকিং অ্যাপসের মাধ্যমে দ্রুত চেক করে তা অস্বীকার করতে হবে। অফিশিয়াল ফেসবুকে কোরাস চিহ্ন দিয়ে পাল্টা পোস্ট করা এবং সেই সঙ্গে সঠিক তথ্য শেয়ার করতে হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘এআই কনটেন্ট সম্পর্কে সবাইকে বাড়তি সচেতন থাকার বিকল্প নেই। কারণ প্রযুক্তির ব্যবহার চাইলেই কমানো যাবে না। নির্বাচন সামনে রেখে প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়তে পারে। আমরা সাধারণত পক্ষে থাকলে চুপ থাকি আর বিপক্ষে গেলে প্রতিবাদ করি। এখান থেকে বের হয়ে আসতে হবে।’

তিনি বলেন, ছবি এবং ভিডিও কনটেন্ট অরিজিনাল কি না, তা পরীক্ষা করার জন্য নানা অ্যাপস আছে। তাই ব্যক্তি এবং দলগুলোকে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কোনো কিছুর অভিযোগ উঠলেই প্রতিটি দলের অ্যাপসের মাধ্যমে প্রমাণসহ সবকিছু দেখাতে বাড়তি সচেতন থাকতে হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন
ট্যাগসঃ

বিস্তারিত লিখুনঃ

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন