বালাগঞ্জে বোয়ালজুড় মাদরাসার সুপারের রাজকীয় সংবর্ধনা অশ্রুসিক্ত চোখে বিদায় জানাল শিক্ষার্থীরা

- আপডেট সময়ঃ ০৬:০১:৪৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ জানুয়ারী ২০২৬
- / ২৭৬ বার পড়া হয়েছে।

১৯৬৪ সালে মাত্র ২৯ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার বোয়ালজুড় শাহ মকসুদ শাহ মনির উদ্দিন (রহ.) হাফিজিয়া দাখিল মাদরাসার সুপার মাওলানা মো. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী। অত্র প্রতিষ্ঠানে সততা আর নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে সবার প্রিয়পাত্র হয়ে ভূয়সী প্রশংসা কুঁড়িয়েছেন তিনি। সর্বজন শ্রদ্ধেয় এই শিক্ষকের সবার সঙ্গে গড়ে ওঠেছে প্রীতি আর ভালোবাসার নিবিড় এক সম্পর্ক। মাদরসার ৬০ বছরপূর্তি উপলক্ষ্যে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পুনর্মিলনী ও অত্র মাদরাসার সুপার মাওলানা মো. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরীর অবসর গ্রহণ উপলক্ষে প্রাক্তন-বর্তমান শিক্ষার্থী ও শিক্ষকবৃন্দের ব্যানারে বর্ণাঢ্য এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। তাইতো বিদায়ের দিনে হাজির হন প্রাক্তন শিক্ষার্থীসহ এলাকার নানা পেশাজীবীর মানুষ। মঞ্চ থেকে ফুলেল শুভেচ্ছাসহ বিদায়ী শিক্ষকের হাতে তুলে দেয়া হয় সম্মাননা স্মারক। এই গুণী শিক্ষকের বিদায়ে মাদরাসার প্রাঙ্গণে সৃষ্টি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ। এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন সহকর্মীসহ শিক্ষার্থীরা। চোখে জল নিয়ে মাদরাসা প্রাঙ্গণ থেকে অবসরে যান তিনি। এমনই রাজকীয় এক সংবর্ধনায় তাকে জানানো হয় বিদায়।
মাওলানা আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরীর জন্ম ১৯৬৬ সালে। তিনি সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার মনসুরপুর গ্রামের মাওলানা মো. ছাখাওয়াত আলী চৌধুরী ওরফে হেকিম সাহেবের সুযোগ্য সন্তান। ১৯৮৬ সালে তিনি জকিগঞ্জের বাদে দেওরাইল ফুলতলী সিনিয়র মাদরাসার সহকারী শিক্ষক (ফাজিল) ও ১৯৮৭ সালে ওই প্রতিষ্ঠানে সহকারী শিক্ষক (কামিল) পদে শিক্ষকতা করেন। ১৯৯১ সালে পহেলা সেপ্টেম্বর বোয়ালজুর মাদরাসার সুপার হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৯৫ সালের শেষ দিকে তিনি সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার নেরাউদি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। পরবর্তী সময়ে ২০০০ সালে পুনবায় বোয়ালজুর মাদরাসায় সুপার পদে দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রায় ৩৫ বছর শিক্ষকতা জীবনের ইতি টেনে অবসর নেন। ৮জানুয়ারি দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দুই অধিবেশনে পুনর্মিলনী ও বিদায়ী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অত্র প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন ছাত্র পরিষদের সভাপতি মিজানুর রহমান খালিছাদার ও মাদরাসার এডহক কমিটির সভাপতি কামরুল হুদা জায়গীরদার।
প্রাক্তন ছাত্র পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা জুয়েল আহমদ লতিফি ও মো. মিজানুর রহমানের যৌথ সঞ্চালনায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় বাদেদেওরাইল ফুলতলী কামিল মাদরাসার সাবেক অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা নজমুদ্দিন চৌধুরী ফুলতলী বলেন এই মাদরাসার সুযোগ্য সুপার মাওলানা আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী আমার ছাত্র। তিনি আমার মাদরাসায় শিক্ষকতা জীবন শুরু করে ছিলেন। এই এলাকার মাটি ও মানুষের সাথে তিনি জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন। তার প্রতি আপনাদের এই মায়া-ভালোবাসা দেখে আমি সত্যিই আনন্দিত ও গর্বিত। তিনি বলেন, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য দেশপ্রেম। আমরা যে কাজই করি না কেন, তা যেন ভালোবাসার সঙ্গে করি। এ জন্য সততা, নিষ্ঠা, মেধা ও মনন থাকতে হবে।
সংবর্ধিত অতিথির বক্তৃতাকালে মাওলানা মো. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী আয়োজক ও এলাকাবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি সবার কাছে দোয়া চেয়ে তার শিক্ষার্থীদের নিয়মিত নামাজ আদায় ও সৎভাবে জীবন-যাপন করার আহবান জানান।
বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন ওসমানীনগরের মাদার বাজার ফয়জুল উলুম হাফিজিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদরাসার অধ্যক্ষ ড. সৈয়দ শহিদ আহমদ বোগদাদি, বালাগঞ্জ সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মুনিম, ইসলামিয়া মোহাম্মদিয়া আলিম মাদরাসার অধ্যক্ষ আব্দুল জব্বার, মুসলিমাবাদ মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কুহিনুর উদ্দিন চৌধুরী, মাওলানা আব্দুল মুসাব্বির, মাওলানা ইলিয়াস আলী আল হুমাইদী, সিরাজুল হক সাইস্তা, বালাগঞ্জ ইউনিয় পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর খালিছাদার, অত্র প্রতিষ্ঠানের সাবেক কমিটির সদস্য সিরাজুজ্জামান খাঁন ও বর্তমান কমিটির সদস্য সৈয়দুর রহমান হারুন।
বক্তৃতা করেন সংবর্ধিত অতিথির ছেলে নাইমুল হাসান চৌধুরী। অত্র প্রতিষ্ঠানের সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে বক্তৃতা করেন সাবুল আহমদ, শফিকুর রহমান, ফখরুল ইসলাম, সাংবাদিক মো. আব্দুস শহিদ, তৌরিছ আলী, খালেদ আহমদ, বাহরাম খান, সায়েম ইবনে খয়ের ও সোনিয়া বিনতে খয়ের প্রমুখ।
প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বাগত বক্তব্য রাখেন হাফিজ মাওলানা মিজানুর রহমান, মাদরাসার ইতিহাস পাঠ করেন মাওলানা জুয়েল আহমদ লতিফি ও বিদায়ী সুপারের জিবনী পাঠ করেন শামীম আহমদ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত করেন শাহরিয়ার খান শাকিব, নাতে রাসুল পরিবেশন করেন আব্দুর রহিম, হামদ পরিবেশন করেন প্রাক্তন ছাত্র ফরহাদ আলম খোকন ও মাদরাসা সংঙ্গীত পরিবেশন করেন হাফিজ ওয়াহিদুর রহমান মাসুম। অনুষ্ঠানে অত্র প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন শিক্ষক, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, অভিভাবকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথির উপস্থিতিতে প্রাক্তন ছাত্র যুক্তরাজ্য প্রবাসী কামরান আহমদ খালিছদারের পক্ষ থেকে সম্মাননা উপহার হিসেবে অবসর গ্রহণ করা সংবর্ধিত শিক্ষককে ৪ লক্ষ টাকা অনুদান দেওয়া হয়।
এছাড়া, আয়োজকদের পক্ষ থেকে অত্র প্রতিষ্ঠানের সাবেক শিক্ষকগণসহ ও সাবেক ও বর্তমান কমিটির সভাপতিকে সম্মামনা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়েছে।
এদিকে, স্মৃতির টানে প্রিয় প্রাঙ্গণে, মিলেছিলেন প্রাণের বন্ধনে। কথা হয় প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে কয়েক জনের সাথে। তারা বলেন, স্মৃতিবিজড়িত এই মাদরাসায় কত সোনালি সময় কাটিয়েছি। পুনর্মিলনীতে এসেছি সহপাঠী ও শিক্ষকদের সঙ্গে দেখা হবে সেই আশায়। এসেই দেখা মিলল প্রিয় শিক্ষক ও প্রাণের বন্ধুদের সঙ্গে। অনুষ্ঠানে এসে কী যে ভালো লাগছে, তা বলে বোঝাতে পারব না। মনে হচ্ছে, সেই দিনগুলোতে ফিরে গেছি। তবে, শেষ দিকে আমাদের পিতৃতুল্য প্রিয় সুপার হুজুরের বিদায় লগ্নে আমাদের এই আনন্দ বিষাদে রুপ নিয়েছে, আমরা নিজেদেরকে ধরে রাখতে পারছি না।
















