বিয়ানীবাজারের দম্পতিসহ কিশোরী গৃহকর্মীর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার,সিসি ক্যামেরাও ছিল অচল

    বিশেষ প্রতিনিধি, সিলেট
  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Aug 12, 2026 ইং 8 বার পঠিত
ছবির ক্যাপশন:
ad728

সিলেট মহানগরীর কোতোয়ালি থানাধীন মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসা থেকে স্বামী-স্ত্রী ও তাদের কিশোরী গৃহকর্মীর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে এ ঘটনায় পুরো এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিহতরা হলেন এম এ সাত্তার (৯০), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) এবং তাদের বাসার কিশোরী গৃহকর্মী তাহমিনা (১৫)। নিহত দম্পতির গ্রামের বাড়ি সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার আকাখাজনা গ্রামে।

প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ ধারণা করছে, পরিকল্পিতভাবেই তিনজনকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সময় হিসেবে বুধবার সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যবর্তী সময়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ওই সময় মিতালী আবাসিক এলাকায় লোডশেডিং চলছিল। ফলে পুরো আবাসিক এলাকার পাশাপাশি নিহতদের বাসায় থাকা সিসি ক্যামেরাও অচল হয়ে পড়ে। তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, সিসি ক্যামেরা অচল থাকার বিষয়টি জেনেই দুর্বৃত্তরা হত্যাকাণ্ডের জন্য ওই সময়টিকে বেছে নিতে পারে।

মিতালী আবাসিক এলাকা পুরোপুরি সিসি ক্যামেরার আওতাধীন। নিহতদের ১১১ নম্বর বাসাতেও নিজস্ব সিসি ক্যামেরা ছিল। কিন্তু সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকায় গুরুত্বপূর্ণ ওই সময়ে কোনো দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ হয়নি। ফলে হত্যাকারীরা কীভাবে বাসায় প্রবেশ করেছে এবং হত্যাকাণ্ডের পর কীভাবে বের হয়েছে, তা এখন তদন্তকারীদের কাছে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সকালে প্রতিবেশীরা বাড়ির দরজা বন্ধ দেখতে পান। একপর্যায়ে দরজার নিচ দিয়ে রক্ত বের হতে দেখে তারা পুলিশকে খবর দেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দরজা খুলে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে।

সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের জানান, তিনজনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ঘটনাস্থল থেকে হত্যায় ব্যবহৃত কোনো অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা যায়নি।

পুলিশ কমিশনার জানান, বাসার ওয়ারড্রোব ও আলমারি খোলা পাওয়া গেছে। স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান জিনিসপত্র খোয়া গেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। ফলে ঘটনাটি চুরি বা ডাকাতির উদ্দেশ্যে সংঘটিত হয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে পারিবারিক বিরোধ কিংবা পূর্বশত্রুতার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ঘটনাস্থলে একটি দলিল পাওয়া গেছে বলেও জানান পুলিশ কমিশনার। দলিলটির সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে।

তদন্তে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বাসায় কর্মরত অপর এক গৃহকর্মীর নিখোঁজ থাকার বিষয়টি। সিকিউরিটি গার্ডের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই বাসায় দুজন গৃহকর্মী কাজ করতেন। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের পর একজনের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি কোথায় রয়েছেন, ঘটনার সময় তিনি বাসায় ছিলেন কি না এবং তার নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

এদিকে নিহত দম্পতির গাড়িচালকের বক্তব্যে সামনে এসেছে নিচতলার সাবেক এক ভাড়াটের সঙ্গে বিরোধের বিষয়টি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গত প্রায় এক মাস ধরে ওই ভাড়াটের সঙ্গে নিহত দম্পতির সমস্যা চলছিল। প্রায় ছয় মাস ধরে ভাড়াটেকে বাসা ছাড়ানোর চেষ্টা করা হলেও তিনি বাসা ছাড়ছিলেন না। পরে গত মাসে তাকে বাসা থেকে বিদায় করা হয়।

মহল্লা কমিটির এক সদস্য জানান, জায়গা-জমির ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ওই ভাড়াটেকে নিয়ে মহল্লা কমিটিতে অভিযোগ করা হয়েছিল। নিহত এম এ সাত্তার নিজেই কমিটির কাছে বিষয়টি নিয়ে বিচারপ্রার্থী হয়েছিলেন। ভাড়া ঠিকমতো না দেওয়া এবং বাসা ছাড়তে না চাওয়ার অভিযোগ ছিল ওই ভাড়াটের বিরুদ্ধে। তবে এই বিরোধের সঙ্গে তিন হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

নিহত এম এ সাত্তার ও তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম মিতালী আবাসিক এলাকার প্রথম দিকের বাসিন্দা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সাত্তার পেশায় ব্যবসায়ী ছিলেন। স্থানীয়ভাবে তিনি আওয়ামী লীগের পুরোনো কর্মী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। তবে বর্তমানে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর তিনি নিষ্ক্রিয় ছিলেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছেন। দুজনই পরিবার নিয়ে লন্ডনে বসবাস করেন।

সিলেট মহানগর পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো. মনজুরুল আলম জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, তিনজনকে গলা কেটে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।

পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম জানান, ঘটনার পরপরই পুলিশের বিশেষ দল তদন্তে কাজ শুরু করেছে। পিবিআই ও সিআইডির ক্রাইমসিন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে বিশেষ তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ঘটনাটি ডাকাতি, পারিবারিক বিরোধ নাকি পূর্বশত্রুতার জেরে ঘটেছে, সব সম্ভাবনাই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি লোডশেডিংয়ের সুযোগ নিয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে সিলেটের এই ট্রিপল মার্ডারে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে লোডশেডিংয়ের সময় নির্বাচন, সিসি ক্যামেরা অচল থাকা, নিখোঁজ গৃহকর্মী, সাবেক ভাড়াটের সঙ্গে বিরোধ এবং বাসা থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র খোয়া যাওয়ার বিষয়গুলো। এসব ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, নাকি একাধিক বিষয়কে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে তিনজনকে হত্যা করা হয়েছে, তা জানতে তদন্ত শেষ হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে নগরবাসী।