সিলেট মহানগরীর রায়নগর রাজবাড়ি আবাসিক এলাকার মিতালি ১১১ নম্বর বাসায় বৃদ্ধ দম্পতি ও তাদের গৃহকর্মীকে হত্যার ঘটনায় বাবুল মিয়া (৪০) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, নিহত গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে বাবুলের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। হত্যাকাণ্ডের পর প্রযুক্তিগত সহায়তা ও বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে তাকে শনাক্ত করা হয়।
বুধবার (১২ আগস্ট) বিকেল আনুমানিক সাড়ে ৩টার দিকে রায়নগর এলাকা থেকে বাবুল মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি রায়নগর রাজবাড়ি এলাকার আক্তার মিয়ার কলোনির বাসিন্দা। তার বাবার নাম মৃত নূর মিয়া। বাবুল পেশায় রংমিস্ত্রি। পাশাপাশি মাঝে মাঝে কসাইয়ের কাজও করতেন বলে জানা গেছে।
বুধবার রাত সাড়ে ৭টার দিকে গণমাধ্যমকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম।
পুলিশ কমিশনার জানান, বুধবার সকাল ৯টা ২৫ মিনিট থেকে ৯টা ৩৫ মিনিটের মধ্যে রায়নগর রাজবাড়ি আবাসিক এলাকার মিতালি ১১১ নম্বর বাসায় হত্যাকাণ্ড ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ শেষে দ্রুত একটি বিশেষ টিম গঠন করে। পরে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে বাবুল মিয়াকে শনাক্ত করা হয়।
গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল মিয়া হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছেন পুলিশ কমিশনার।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহত আব্দুস সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম এবং গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে বাবুল মিয়ার পূর্বপরিচয় ছিল। প্রায় ১৫ থেকে ২০ দিন আগে তাহমিনার সঙ্গে বাবুলের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বাবুল ওই বাড়িতে আগে রাজমিস্ত্রি ও রংমিস্ত্রির কাজও করেছিলেন।
পুলিশ কমিশনারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বুধবার বাবুল একটি ছুরি নিয়ে ওই বাড়িতে যান। দরজায় নক করলে গৃহকর্মী তাহমিনা দরজা খুলে তাকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেন। পরে একটি কক্ষে তাহমিনার সঙ্গে বাবুলের কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে বাবুল ছুরি দিয়ে তাহমিনাকে আঘাত করেন। এ সময় সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে তার সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয় এবং একপর্যায়ে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়।
তিনজনকে হত্যার পর বাবুল মিয়া বারান্দা দিয়ে পালিয়ে রায়নগর এলাকায় নিজের বাসায় ফিরে যান বলে জানিয়েছে পুলিশ। পরে পুলিশের বিশেষ টিম সেখানে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে।
হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিটির বিষয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, বাবুলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি জঙ্গল এলাকায় ছুরিটি উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে আরও বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে।
বাবুল মিয়া তার বাড়ি চাঁদপুর বলে পুলিশকে জানিয়েছেন। তবে তার দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত ঠিকানা নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কমিশনার।
বুধবার সকাল ৯টার দিকে রায়নগর এলাকার ওই বাসা থেকে চিৎকারের শব্দ শুনতে পান আশপাশের লোকজন। বাসায় অসুস্থ কেউ চিৎকার করছেন—এমনটা ভেবে প্রথমে কেউ এগিয়ে যাননি। পরে সকাল ১০টার দিকে বাসার রঙের কাজের জন্য এক মিস্ত্রি এসে ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া পাননি।
এ সময় পাশের ভবনের দ্বিতীয় তলার এক ভাড়াটে দেখতে পান, আব্দুস সাত্তারের বাসার দরজার নিচ দিয়ে বারান্দায় রক্ত গড়িয়ে বের হচ্ছে। বিষয়টি জানাজানি হলে আশপাশের লোকজন জড়ো হন এবং পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বাসার প্রধান দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। আনুমানিক পৌনে ৫টার দিকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
নিহতরা হলেন রায়নগর রাজবাড়ি এলাকার মিতালি ১১১ নম্বর বাসার মালিক মৃত আবরু মিয়ার ছেলে মো. আব্দুস সাত্তার (৮২), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) এবং গৃহপরিচারিকা তাহমিনা (২৫)।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, বাসার একটি কক্ষে আব্দুস সাত্তারের এবং অপর একটি কক্ষে সুরাইয়া বেগম ও তাহমিনার রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে ছিল। বাসার দক্ষিণ দিকের একটি দরজা দিয়ে ঘাতক পালিয়ে যাওয়ার আলামতও পাওয়া যায়। দোতলা থেকে নিচে নামার পথে রক্তের দাগ ছিল বলেও জানান তারা।
এ ঘটনায় বুধবার রাত পর্যন্ত কোনো মামলা দায়ের হয়নি বলে জানিয়েছেন কোতোয়ালী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খান মুহাম্মদ মাইনুল জাকির।
হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার, হত্যার প্রকৃত কারণ এবং এর সঙ্গে আর কেউ জড়িত কি না, তা তদন্ত করে দেখছে পুলিশ।