ডেস্ক নিউজ: কুরবানির ঈদ! পৃথিবীর কোটি কোটি মুসলমানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও লাখ লাখ পশু কুরবানি দেওয়া হবে। বছরের এই বিশেষ দিনটি কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি আত্মত্যাগ, আত্মশুদ্ধি, সংযম এবং মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের প্রতীক। কুরবানির মধ্যে বাহ্যিক একটি কাজ থাকলেও এর অন্তর্নিহিত শিক্ষা অনেক গভীর।আমরা পশু কুরবানি করি, কিন্তু সেই কুরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য কি কেবল পশুর রক্ত ঝরানো? নাকি নিজের ভেতরের অন্যায় প্রবৃত্তি, লোভ, নিষ্ঠুরতা এবং অহংকারকে বিসর্জন দেওয়া? এই প্রশ্নটি আজও প্রাসঙ্গিক। কারণ কুরবানির শিক্ষা যদি মানুষের চরিত্রে প্রতিফলিত না হয়, তবে সেই কুরবানির পূর্ণতা কতটুকু অর্জিত হয়— সেটি ভেবে দেখার বিষয়।
কুরবানি শব্দের অর্থ উৎসর্গ করা, নৈকট্য অর্জন করা। মানুষ মহান সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় জিনিস ত্যাগ করার মানসিকতা তৈরি করে। ইতিহাস আমাদের শেখায়, কুরবানির মূল শিক্ষা কখনো প্রাণহানি নয়— বরং আত্মসমর্পণ, আনুগত্য এবং হৃদয়ের পরিশুদ্ধি।
কিন্তু আমাদের বাস্তব সমাজের দিকে তাকালে কখনো কখনো এক ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। ঈদের সময় আমরা আয়োজন করি, পশু কিনি, সামাজিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিই— কিন্তু নিজেদের ভেতরের পরিবর্তনের কথা কতটুকু ভাবি? আমাদের আচরণ, মানবিকতা, বিবেক— এসব কি পরিবর্তিত হয়?
আজ আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি যেখানে মানুষের হাতে মানুষের কষ্টের ঘটনা নতুন কিছু নয়। লোভের কাছে মানবিকতা পরাজিত হয়, স্বার্থের কাছে বিবেক হারিয়ে যায়। সমাজের বিভিন্ন স্তরে আমরা দেখি— ক্ষমতা, অর্থ এবং ব্যক্তিগত লাভের জন্য মানুষ অন্য মানুষের জীবনকেও কখনো গুরুত্বহীন করে ফেলে।
একটি ছোট্ট শিশুর কথা কল্পনা করুন। সে অসুস্থ। পরিবারের সবাই তাকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটছে। মা সারা রাত জেগে আছে, বাবা শেষ সঞ্চয়টুকু নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করছে। শিশুটি হয়তো দুর্বল কণ্ঠে পানির জন্য ডাকছে, মায়ের হাত শক্ত করে ধরে বাঁচতে চাইছে।
কিন্তু যদি সেই মুহূর্তে চিকিৎসা মানবিক সেবা না হয়ে ব্যবসায় পরিণত হয়? যদি একজন রোগীকে একজন মানুষ হিসেবে না দেখে কেবল আয়ের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়? যদি প্রয়োজনের চেয়ে লাভ বড় হয়ে যায়? তখন সেই শিশুর মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের ক্ষতি নয়— সেটি মানবিকতারও পরাজয়।
আমরা তখন প্রশ্ন করতে বাধ্য হই— আসল পশুত্ব কোথায়? কুরবানির মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা নিরীহ পশুর মধ্যে, নাকি মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সীমাহীন লোভের মধ্যে?
যখন একজন মানুষ অর্থের জন্য অন্য মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করে, যখন একজন দুর্বল মানুষের অসহায়ত্বকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে, যখন ক্ষমতা বা লাভের জন্য বিবেককে বিসর্জন দেয়— তখন সেই আচরণকে কী নামে ডাকা যায়?
আমরা প্রায়ই বলি— পশুত্বকে কুরবানি করতে হবে। কিন্তু পশুত্ব বলতে কেবল রাগ, ক্রোধ বা হিংস্রতাকে বোঝায় না। পশুত্ব হলো নিষ্ঠুরতা। পশুত্ব হলো অন্যের কান্না অনুভব না করা। পশুত্ব হলো নিজের লাভের জন্য অন্যের জীবনকে তুচ্ছ করে ফেলা।
কুরবানির ঈদ আমাদের শেখায়— ত্যাগ করতে। কিন্তু সেই ত্যাগ যদি কেবল পশুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে আর মানুষ নিজের ভেতরের লোভ, প্রতারণা, অহংকার এবং নিষ্ঠুরতাকে আগলে রাখে— তাহলে সেই শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
ঈদের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন একজন ধনী দরিদ্রের পাশে দাঁড়ায়। যখন একজন চিকিৎসক রোগীকে নিজের পরিবারের সদস্যের মতো দেখে। যখন একজন ব্যবসায়ী মুনাফার আগে নৈতিকতাকে গুরুত্ব দেয়। যখন একজন নাগরিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস দেখায়।
আজ আমাদের নিজেদের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন করা উচিত—
আমি কি আমার অহংকারকে কুরবানি করেছি?
আমি কি আমার লোভকে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি?
আমি কি দুর্বল মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালন করছি?
আমি কি অন্যের কষ্ট অনুভব করি?
কারণ কুরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল উৎসব পালন নয়; বরং মানুষকে আরও ভালো মানুষে পরিণত করা। সমাজকে আরও ন্যায়ভিত্তিক করা। মানুষের হৃদয়ে দয়া, সহমর্মিতা এবং দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলা।
পশুর রক্ত একদিন শুকিয়ে যায়। কিন্তু মানুষের ভেতরের নিষ্ঠুরতা যদি থেকে যায়, তাহলে সমাজে অন্ধকার থেকেই যায়। সেই অন্ধকার দূর করার জন্য প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, নৈতিকতা এবং প্রকৃত আত্মত্যাগ।
এ কুরবানির ঈদে আমাদের প্রার্থনা হোক—
মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের বাহ্যিক কুরবানির পাশাপাশি অন্তরের কুরবানির শক্তি দান করুন। আমাদের এমন মানুষ বানান, যারা অসহায়ের পাশে দাঁড়াবে, শিশুর কান্না শুনবে, লোভের কাছে আত্মসমর্পণ করবে না এবং মানবিকতাকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেবে।
কুরবানি হোক শুধু পশুর নয়—
কুরবানি হোক আমাদের অহংকারের।
কুরবানি হোক আমাদের লোভের।
কুরবানি হোক আমাদের নিষ্ঠুরতার।
কুরবানি হোক আমাদের অমানবিকতার।
সেই কুরবানিই একদিন মানুষকে মানুষ বানাবে, সমাজকে আরও সুন্দর করবে, আর ঈদের প্রকৃত শিক্ষা বাস্তব জীবনে প্রতিষ্ঠা করবে।
ড. মো. রুহুল আমিন সরকার, অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার, সিআইডি ঢাকা।