
উত্তরা, ৫ আগস্ট ২০২৪: সেদিন ঢাকা শহরের আকাশ ছিল পরিবর্তনের আনন্দে মুখর। শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশ ত্যাগের খবরে রাস্তায় নেমেছিল অগণিত মানুষ। সেই বিজয় মিছিলের আনন্দ দেখতে মা-বাবার হাত ধরে রাস্তায় বেরিয়েছিল ৬ বছরের শিশু জাবির ইব্রাহিম। কিন্তু কে জানত, যে রাস্তায় সে আনন্দ করতে গিয়েছিল, সেই রাস্তাই তার জীবনের শেষ ঠিকানা হয়ে থাকবে? বিজয় মিছিলের উল্লাসের মাঝে একটি বুলেট কেড়ে নিল জাবিরের প্রাণ, আর সেই সাথে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল একটি পরিবার।
জাবিরের মা রোকেয়া বেগম স্মৃতি হাতড়ে বলছিলেন সেই কালো মুহূর্তের কথা। পরিবারের সিদ্ধান্ত ছিল শিক্ষার্থীদের লংমার্চে সংহতি প্রকাশ করার। জাবিরকে দাদির কাছে রেখে যেতে চেয়েছিলেন মা-বাবা। কিন্তু ছোট্ট জাবির জেদ ধরেছিল, সেও মিছিলে যাবে। মায়ের ভাষায়, "অনেকটা বাধ্য হয়েই ওকে সঙ্গে নিয়েছিলাম।" জসিমউদ্দীন সড়কে যখন সবাই উল্লাসে মেতে ছিল, বাবা কবির হোসেন ও মা রোকেয়া বেগম তাদের আদরের সন্তানকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন রাস্তার একপাশে।
হঠাৎই পরিস্থিতি বদলে যায়। উত্তরা পূর্ব থানার সামনে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ শুরু হয়। চারপাশ থেকে শোনা যাচ্ছিল গুলির শব্দ। মা রোকেয়া বেগম আর্তনাদ করে বলেন, "গুলি শুরু হলে মনে হচ্ছিল আতশবাজি ফোটানো হচ্ছে।" আতঙ্কিত বাবা কবির হোসেন জাবিরের হাত ধরে প্রাণপণে দৌড় দেন। কিন্তু দৌড়াতে গিয়ে জাবির পড়ে যায়। পেছনে ফিরে মা দেখেন, জাবিরের উরুতে গুলি লেগেছে। ফিনকি দিয়ে বের হওয়া রক্তে ওর পরনের প্যান্ট, এমনকি বাবার শরীরও ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছে।
রক্তাক্ত সন্তানকে কোলে নিয়ে বাবা দৌড়াতে থাকেন নিকটস্থ হাসপাতালের দিকে। কিন্তু সেই হাসপাতাল যেন ছিল এক গোলকধাঁধা। চিকিৎসকরা রক্ত দিতে বললেও, সেখানে রক্ত পরীক্ষার বা ক্রস ম্যাচের কোনো সুবিধাই ছিল না। মূল্যবান সময় নষ্ট হওয়ার পর জাবিরকে দ্রুত পাঠানো হয় অন্য একটি হাসপাতালে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। চিকিৎসকরা জাবিরকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুর সনদে লেখা হয় ‘ব্রড ডেড’ বা মৃত্যু অবস্থায় আনা হয়েছে। যে হাত ধরে জাবির পৃথিবীতে পথ চলতে শিখেছিল, সেই বাবার চোখের সামনেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল তার প্রিয় সন্তান।
প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে জাবির তার মা-বাবাকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করত, "আম্মু, এত সকালে ওঠো কেন?" যে সন্তানটি ছাড়া এক মুহূর্ত কাটত না, আজ তাকে ছাড়া প্রতিটি সেকেন্ড মনে হয় এক অনন্ত যন্ত্রণার নাম। জাবিরের মা রোকেয়া বেগম আজ শোককে শক্তিতে রূপান্তর করেছেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পরও তার মূল লক্ষ্য হলো সন্তান হত্যার বিচার নিশ্চিত করা। তিনি বারবারই জোর দিয়ে বলেছেন, "আমি শুধু জাবিরের মা নই, প্রতিটি বাচ্চার মা। একজন মা হয়ে প্রতিটি বাচ্চার হত্যার বিচার চাই।" তিনি তৎকালীন সরকার ও দায়িত্বরত পুলিশের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
দক্ষিণখানের মোল্লারটেকের স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলের শিশু শ্রেণিতে পড়ত জাবির। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার ছোট জাবির ছিল পরিবারের মধ্যমণি। আজ তার খেলার সাথীরা বিদ্যালয়ে ফিরে গেলেও, জাবিরের চেয়ারটি পড়ে আছে চিরশূন্য।
জাবিরের চলে যাওয়া কেবল একটি পরিবারের শোক নয়, এটি ৫ আগস্টের সেই উত্তাল দিনে হারিয়ে যাওয়া অসংখ্য স্বপ্নের একটি। জাবিরের রক্তে ভেজা পথ আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অস্ত্রের চেয়ে মূল্যবান মানুষের জীবন। আজ তার মা রোকেয়া বেগম যে রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্য দিয়ে বিচারের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, তা হয়তো জাবিরের মতো শত শত শহীদের মায়ের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা।