
কিছু তারকা পর্দায় আসেন, আলো ছড়ান, তারপর সময়ের স্রোতে হারিয়ে যান। আবার কেউ কেউ চলে গিয়েও চিরদিনের জন্য থেকে যান দর্শকের হৃদয়ে। তাদের অভিনয়, স্নিগ্ধ হাসি, পোশাক, সংলাপ কিংবা পর্দায় উপস্থিতির বিশেষ ভঙ্গি প্রজন্ম পেরিয়ে নতুন করে আবিষ্কৃত হয়। ঢালিউডের অমর নায়ক সালমান শাহ তেমনই এক নাম। মৃত্যুর তিন দশক পূর্ণ হতে চললেও তার জনপ্রিয়তায় এতটুকু ভাটা পড়েনি; বরং সময় যত গড়াচ্ছে, নব্বইয়ের সেই স্বপ্নের নায়ককে ঘিরে নতুন করে তৈরি হচ্ছে আবেগ ও নস্টালজিয়া।
‘বাবা বলে ছেলে নাম করবে, সারা পৃথিবী তাকে মনে রাখবে’—গানের এই পঙ্ক্তিগুলো যেন অদ্ভুতভাবে মিলে যায় সালমান শাহর জীবনের সঙ্গে। সংক্ষিপ্ত ক্যারিয়ারে তিনি যা সৃষ্টি করে গেছেন, তা বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। স্নিগ্ধ হাসি, স্মার্ট উপস্থিতি, সাবলীল অভিনয় আর নিজস্ব ফ্যাশন—সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক প্রজন্মের স্বপ্নের নায়ক।
মাত্র কয়েক বছরের ক্যারিয়ারে যে তরুণ লাখো দর্শকের ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছে গিয়েছিলেন, তার এমন আকস্মিক মৃত্যু মেনে নিতে পারেননি ভক্তরা। চারদিকে নেমে আসে শোকের ছায়া। দেশ-বিদেশের সংবাদমাধ্যমে খবরটি পায় বিশেষ গুরুত্ব। সালমানের প্রয়াণে ঢালিউডে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তার কোনো বিকল্প আজও তৈরি হয়নি। পরবর্তী সময়ে অনেক নায়ককে সালমানের আদলে সাজিয়ে পর্দায় হাজির করার চেষ্টা করা হলেও পোশাক, চুল বা আচরণে কেউ তার বিকল্প হয়ে উঠতে পারেননি। কারণ, সালমান শুধু একজন নায়ক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি সময়ের প্রতিনিধিত্বকারী সাংস্কৃতিক প্রতীক।
চলচ্চিত্রে সালমানের অভিষেক ঘটে ১৯৯৩ সালে, সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার মাধ্যমে। প্রথম সিনেমাতেই ‘ইমন’ নামে পরিচিত এই তরুণ actor হয়ে ওঠেন দর্শকের নতুন আবিষ্কার। এরপর ‘সালমান শাহ’ নামটিই ধীরে ধীরে পরিণত হয় মহাতারকা এক পরিচয়ে।
তবে অভিনয়ের জগতে তার উপস্থিতি হঠাৎ করে নয়। ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটের দাড়িয়াপাড়ায় নানাবাড়িতে জন্ম তার। বাবা কমরউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী ছিলেন ম্যাজিস্ট্রেট এবং মা নীলা চৌধুরী যুক্ত ছিলেন রাজনীতি ও সংগীতের সঙ্গে। সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে ওঠা সালমানের ভেতরে ছোটবেলা থেকেই ছিল শিল্পের প্রতি আলাদা টান। আশির দশকের মাঝামাঝি হানিফ সংকেতের গ্রন্থনা ও উপস্থাপনায় প্রচারিত ‘কথার কথা’ অনুষ্ঠানের ‘নামটি ছিল তার অপূর্ব’ গানের মিউজিক ভিডিওতে অভিনয় করেছিলেন তিনি। সেখান থেকেই বিনোদন অঙ্গনে তার প্রথম পথচলা।
সালমান শাহর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি শুধু অভিনয় দিয়েই নয়, নিজের স্টাইল দিয়েও গোটা একটি প্রজন্মকে повлия করেছিলেন। ব্যাকব্রাশ চুল, মাথায় ব্যান্ডেনা, টি-শার্ট, জিন্স, বাহারি টুপি, কলারে রুমাল কিংবা হাতের ঘড়ি—তার ব্যবহার করা প্রায় প্রতিটি ফ্যাশন অনুষঙ্গই হয়ে উঠেছিল তরুণদের কাছে অন্ধ অনুকরণীয়। বলা যায়, অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি নিজেই হয়ে উঠেছিলেন একটি ফ্যাশন ট্রেন্ড।
তাকে ঘিরে ভক্তদের উন্মাদনাও ছিল বিস্ময়কর। ১৯৯৪ সালে ‘তুমি আমার’ সিনেমার আউটডোর শুটিংয়ে কক্সবাজারে অটোগ্রাফ না পেয়ে এক তরুণী পাহাড় থেকে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। আনন্দ বিচিত্রায় প্রকাশিত এই খবরটি সালমানের নজরে এলে তিনি দ্রুত তাকে উদ্ধার করেন এবং এমন কাজ না করার জন্য বোঝান। মৃত্যুর এতদিন পরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ছবি, ভিডিও ও স্মৃতিচারণ প্রমাণ করে—সালমানের জনপ্রিয়তা সময়ের সীমানায় আটকে নেই।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে অনেক জনপ্রিয় নায়ক এসেছেন, দর্শকের ভালোবাসাও পেয়েছেন। কিন্তু সালমান শাহর ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা। তিনি ছিলেন সময়ের চেয়ে অনেক দূর এগিয়ে থাকা এক তারকা। অভিনয়ের পাশাপাশি পোশাক, চুলের স্টাইল, কথা বলার ধরন থেকে শুরু করে পর্দায় নায়কের উপস্থাপন—সবকিছুতেই ছিল নিজস্বতা। কখনো রোমান্টিক তরুণ, কখনো বিদ্রোহী যুবক, আবার কখনো আবেগপ্রবণ প্রেমিক—প্রতিটি চরিত্রেই তিনি ফুটিয়ে তুলেছিলেন আলাদা ছাপ। সম্ভবত এ কারণেই নতুন প্রজন্মের কাছেও তিনি পুরোনো হয়ে যাননি; বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বদৌলতে নবীন দর্শকের কাছেও বারবার ফিরে আসছেন সেই স্বপ্নের নায়ক।
সালমান শাহর মৃত্যু নিয়ে রহস্য ও বিতর্কও তার স্মৃতিকে আলোচনার কেন্দ্রে রেখেছে। ১৯৯৬ সালের সেই আকস্মিক মৃত্যুর পর থেকেই নানা প্রশ্ন ঘুরে বেড়িয়েছে—এটি আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড? সম্প্রতি নায়কের মৃত্যুকে ঘিরে মামলা নতুন মোড় নিয়েছে:
গত ৯ আগস্ট, বিমানবন্দর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় এই মামলার অন্যতম আসামি ও খলচরিত্রের অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডন-কে।
সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তার ভাই আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে গত বছরের অক্টোবরে রাজধানীর রমনা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলায় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, খল চরিত্রের অভিনেতা ডন, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুসি, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, রুবী, আ. ছাত্তার, সাজু এবং রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদসহ মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে।
তিন দশক পার হলেও সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্য উদঘাটন এবং তাকে ঘিরে ভক্তদের আবেগ—দুটোই আজও সমানভাবে জীবন্ত।