
বাংলার লোকসংস্কৃতি ও প্রাচীন ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান ধারক নৌকা বাইচ। মুসলিম নবাব-বাদশাহদের আমল থেকে পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া এই লোকজ খেলাটি কালের বিবর্তনে অনেকটাই হারিয়ে গেলেও আজও কিছু উৎসাহী মানুষের হাত ধরে টিকে আছে। বর্ষার মৌসুমে নদী-নালা, খাল-বিল পানিতে ভরে উঠলেই যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় নৌকা বাইচের ঐতিহ্য।
সম্প্রতি বিয়ানীবাজার উপজেলার বারইগ্রাম এলাকায় নৌকা বাইচ আয়োজনকে কেন্দ্র করে বেশ উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বাইচ আয়োজন নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষে দুটি গ্রুপ তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত সব অচলাবস্থা দূর হয়েছে। আগামীকাল ১৩ সেপ্টেম্বর সুনাই নদীতে নৌকা বাইচের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এছাড়া উপজেলার চারখাই ও মুড়িয়ার ভাটাউছি এলাকাতেও সম্প্রতি নৌকা বাইচের আয়োজন করা হয়েছে। ফলে নৌকা বাইচকে ঘিরে পুরো উপজেলায় চলছে আলোচনা ও উৎসাহ-উদ্দীপনা। সেই সঙ্গে মানুষের মুখে মুখে ফিরছে বাইচের সেকাল-একাল আর বাইচালদের নানা গল্প।
নদীমাতৃক বাংলাদেশে বর্ষাকাল এলেই যখন নদী-নালা, খাল-বিল কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে, তখনই যেন বেজে ওঠে নৌকা বাইচের দামামা। হাজারো দর্শকের উল্লাস আর উৎসবমুখর পরিবেশে পানসি নৌকাগুলো যখন নদীর বুক চিরে ছুটে চলে, তখন জীবন্ত হয়ে ওঠে বাংলার চিরায়ত গ্রামীণ রূপ।
কিছুদিন আগে বিয়ানীবাজারের চারখাইয়ে সুরমা নদীতে অনুষ্ঠিত নৌকা বাইচে অংশ নেয় সাতটি সুসজ্জিত পানসি নৌকা। নবীন-প্রবীণ বাইচাল, আয়োজক ও বাদ্যযন্ত্রীদের শ্রম, মেধা ও আন্তরিকতায় আয়োজিত এ বাইচ যেন প্রাচীন এই লোকজ সংস্কৃতিকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। আর সেই আয়োজন ঘিরেই উঠে আসে বাইচালদের অভিজ্ঞতা, আনন্দ, অর্জন ও ব্যর্থতার নানা অম্লমধুর গল্প।
নৌকা বাইচ অনেকের কাছে শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়; এটি নেশা, শখ ও ভালোবাসার বিষয়। লাউতার জলঢুপ দক্ষিণ পাড়িয়াবহর গ্রামের ৪৫ বছর ধরে বৈঠা টানা প্রবীণ বাইচাল আবুল কালামের গল্পটি তেমনই। তার বাবা জসির উদ্দিনও ছিলেন নামকরা বাইচাল। বিনোদন ও শখের বশেই আবুল কালাম এখনও বৈঠা হাতে নদীতে নামেন। নদীর দুই পাড়ে হাজারো মানুষের উল্লাস তার নৌকার গতি ও শক্তি যেন আরও বাড়িয়ে দেয়।
চারখাই শিকারপুর গ্রামের প্রবীণ বাইচাল মোতালেব হোসেন খানের স্মৃতিতে লুকিয়ে আছে নৌকা বাইচের সোনালি অতীত। সত্তরের দশকে বাবার হাত ধরে তিনি নৌকায় উঠতেন। তার স্মৃতিচারণে জানা যায়, সে সময় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা চাঁদা তুলে একটি পানসি তৈরি করা যেত। সময়ের ব্যবধানে সেই খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকায়।
মোতালেব হোসেনের স্মৃতির পাতায় সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে কুশিয়ারা নদীতে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ নৌযাত্রার কথা। ৫০ জন বাইচাল নিয়ে প্রায় ৬০ ফুট দীর্ঘ পানসিতে দীর্ঘ সময় বৈঠা টেনেছিলেন তারা। ক্লান্তি দূর করতে গাওয়া হতো সারিগান—‘আজ আমার বন্ধু নাই ঘরে, উজান বাতাসে শাড়ি ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে…’ কিংবা ‘হাত ছাইড়া দেও সোনার দেওয়ারে…’। চিঁড়া, গুড় ও মুড়ি খেয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সেবার তারা তৃতীয় স্থান অর্জন করে পুরস্কার হিসেবে পেয়েছিলেন একটি রেডিও। সেই অর্জনের আনন্দ আজও তাকে আলোড়িত করে।
নৌকা বাইচে যেমন রয়েছে বাঁধভাঙা উল্লাস, তেমনি রয়েছে হৃদয়ভাঙা কষ্ট, পরাজয়ের বেদনা ও জয়ের আনন্দ। তবে এই ঐতিহ্য যাতে হারিয়ে না যায়, সে জন্য এখন হাল ধরছেন নবীন প্রজন্মের বাইচালরাও।
কালিজুরী গ্রামের যুবক আব্দুল আলীম গত পাঁচ বছর ধরে পানসির বাইচাল হিসেবে অংশ নিচ্ছেন। তার কাছে নৌকা বাইচ কোনো বাণিজ্যিক বিষয় নয়; বরং বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখার একান্ত প্রচেষ্টা। আলীমের মতো হিরা, জহির, আব্দুল করিম, নান্নু মিয়া ও শাহাদত হোসেনের মতো তরুণরা মনে করেন, বর্তমান প্রজন্ম হিসেবে এই ঐতিহ্যকে লালন ও সংরক্ষণ করা তাদের দায়িত্ব।
শিশুবেলায় দাদা-নানার কাছে শোনা নৌকা বাইচের গল্প যখন বাস্তবে চোখের সামনে ধরা দেয়, তখন দর্শকদের মুগ্ধতারও যেন শেষ থাকে না। সাকিব হোসেন, মামুন রেজা ও সুমন আহমেদের মতো কলেজপড়ুয়া দর্শকদের ভাষায়, পড়ন্ত বিকেলে নদীর রূপালি জলরাশিতে পানসিগুলোর ছুটে চলা, সারিগানের সুর আর বাদ্যের তালে তালে হাজারো মানুষের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অভাবনীয় দৃশ্য।
নদীর দুই পাড়ে হাজারো মানুষের হইহুল্লোড়, উচ্ছ্বাস আর উৎসবমুখর পরিবেশের এমন প্রাণবন্ত রূপ একমাত্র নৌকা বাইচেই দেখা সম্ভব। এটি কেবল একটি লোকজ প্রতিযোগিতা নয়; বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক অনন্য রত্ন। সময়ের স্রোতে অনেক কিছু হারিয়ে গেলেও নদীর বুকে বৈঠার ছন্দে নৌকা বাইচ আজও মনে করিয়ে দেয়—বাংলার লোকজ ঐতিহ্য এখনও বেঁচে আছে, বেঁচে থাকবে।