কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তোলপাড়: পলাতক আ.লীগ নেতা মান্নান মিন্টু, গ্রেপ্তার দুই সহযোগী

    স্টাফ রিপোর্টার:
  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Jul 14, 2026 ইং 206 বার পঠিত
ছবির ক্যাপশন:
ad728

সিলেটের বিয়ানীবাজারে আলোচিত শাহজালাল সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি লিমিটেড-কে ঘিরে অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগে নতুন মোড় নিয়েছে পরিস্থিতি। এক ভুক্তভোগীর দায়ের করা মামলায় সমিতির দুই কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে মামলার প্রধান আসামি, প্রতিষ্ঠানটির প্রধান এবং আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল মান্নান মিন্টু এখনও পলাতক রয়েছেন।

সোমবার (১৪ জুলাই) সন্ধ্যায় বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিয়ানীবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু জাফর মোহাম্মদ মাহফুজুল কবির।

গ্রেপ্তার হওয়া দুজন হলেন মাথিউরা ইউনিয়নের দুধবকশী গ্রামের মৃত আতাউর রহমানের মেয়ে খালেদা বেগম, যিনি সমিতির ক্যাশিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন এবং বিয়ানীবাজার পৌরসভার নয়াগ্রামের সিরাজ উদ্দিনের ছেলে খয়রুল ইসলাম, যিনি রিসেপশনিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তারা ভুক্তভোগী তাহেরা পারভীন শেফার দায়ের করা মামলার (মামলা নং-২৫, ১৮ জুন ২০২৬) ২ ও ৩ নম্বর এজাহারভুক্ত আসামি। মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে আব্দুল মান্নান মিন্টুকে।

মামলার বাদী তাহেরা পারভীন শেফা জানান, প্রতিবন্ধী এক বোন ও একমাত্র সন্তানকে নিয়ে অনেক কষ্টে সংসার চালিয়ে জীবনের কষ্টার্জিত অর্থ সমিতিতে জমা রেখেছিলেন। কিন্তু গত দুই বছর ধরে বারবার অফিসে গিয়েও সেই অর্থ ফেরত পাননি। বরং অবহেলা, আশ্বাস ও নানা অজুহাতের সম্মুখীন হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে আদালতের শরণাপন্ন হয়ে মামলা দায়ের করেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিয়ানীবাজার পৌরশহরের কলেজ রোডে প্রতিষ্ঠিত এই সমিতি কয়েক বছরের মধ্যে বিয়ানীবাজারসহ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলার হাজারো গ্রাহকের কাছ থেকে অধিক লাভের প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ আমানত সংগ্রহ করে। শুরুতে নিয়মিত লাভাংশ প্রদান করা হলেও পরবর্তীতে নানা অজুহাতে আমানত ও লাভাংশ পরিশোধ বন্ধ হয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গত বছরের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। এরপর থেকে আমানতকারীরা বারবার অফিসে গেলেও জমাকৃত অর্থ কিংবা প্রতিশ্রুত লাভাংশ ফেরত পাননি। অনেকের অভিযোগ, টাকা চাইতে গেলে তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে, এমনকি কয়েকজন মারধরেরও শিকার হয়েছেন।

তিলপাড়া ইউনিয়নের দাসউরা গ্রামের প্রবাসফেরত সিদ্দিক আহমদ বলেন, সৌদি আরবে উপার্জিত প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা তিনি সমিতিতে জমা রেখেছিলেন। দেশে ফিরে সেই অর্থ দিয়ে ঘর নির্মাণ ও পারিবারিক কাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু টাকা চাইতে গিয়ে মারধরের শিকার হয়ে মাথায় আঘাত পেয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

একই ইউনিয়নের জসিম উদ্দিন ও জয়নুল ইসলাম বলেন, প্রায় দেড় বছর ধরে সমিতির কর্মকর্তাদের পেছনে ঘুরেও তারা মূলধনের কোনো অর্থ ফেরত পাননি। কয়েক দফায় সামান্য কিছু টাকা দেওয়া হলেও সেটি মোট আমানতের তুলনায় নগণ্য। প্রতিবারই আশ্বাস, হুমকি ও গালিগালাজের মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল মান্নান মিন্টুর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে দুই কর্মকর্তা গ্রেপ্তারের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। তাদের দাবি, শুধু কর্মকর্তা নয়, অভিযোগের সঙ্গে জড়িত মূল হোতাসহ সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের অর্থ দ্রুত ফেরত নিশ্চিত করা হোক।

বিয়ানীবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু জাফর মোহাম্মদ মাহফুজুল কবির বলেন, একজন ভুক্তভোগীর দায়ের করা মামলায় দুই কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রধান আসামিসহ অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

দুই কর্মকর্তা গ্রেপ্তারের পর বিয়ানীবাজারজুড়ে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কষ্টার্জিত অর্থ ফেরত না পেয়ে ক্ষোভ, হতাশা ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন অনেক আমানতকারী। স্থানীয়দের দাবি, কেউ প্রবাসে রক্ত-ঘাম ঝরিয়ে উপার্জিত অর্থ, কেউ জমি বিক্রির টাকা, আবার কেউ সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য জমানো সঞ্চয় এই সমিতিতে রেখেছিলেন। সেই অর্থ ফেরত না পাওয়ায় বহু পরিবার আজ চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে।

পৌর শহরের এক ব্যবসায়ী বলেন, “মানুষ বিশ্বাস করেই এই প্রতিষ্ঠানে টাকা জমা রেখেছিল। আজ সেই বিশ্বাস ভেঙে গেছে। আমরা চাই, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের আইনের আওতায় এনে ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ দ্রুত ফিরিয়ে দেওয়া হোক।”

একজন প্রবাসীর স্বজন বলেন, “বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জিত অর্থ নিরাপদ ভেবে এই সমিতিতে রাখা হয়েছিল। এখন সেই টাকা আটকে থাকায় অনেক পরিবার দিশেহারা। আমরা দ্রুত বিচার এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের দাবি জানাই।”

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ দ্রুত ফেরতের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তাদের ভাষ্য, ন্যায়বিচার নিশ্চিত হলে সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরে আসবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি অনেকটাই রোধ করা সম্ভব হবে।