৯১ বছরের ঐতিহ্য জলঢুপ উচ্চ বিদ্যালয়ে, সংকটে শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থীদের মনোযোগ

    নিজস্ব প্রতিবেদক :
  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Aug 8, 2026 ইং 3 বার পঠিত
ছবির ক্যাপশন:
ad728

আমরা শিক্ষকদের ভয় পেতাম। তবে সেটা ছিল শ্রদ্ধার ভয়। তারা আমাদের মন দিয়ে পড়াতেন, গড়ে তুলতেন। আমরা চেষ্টা করেছি তাদের শিক্ষা নিয়ে আজকের অবস্থানে আসতে। খুব মিস করি জলঢুপ উচ্চ বিদ্যালয়কে। আমি যতটুকুই ক্ষুদ্র বা যা কিছু হতে পেরেছি, মনে করি স্কুলের শিক্ষক, পরিবেশ, ঘাস-মাটি আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।”

আবেগঘন কথাগুলো বলেন রাজধানীতে কর্মরত সাংবাদিক ও জলঢুপ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী আজিজুল পারভেজ

শুধু আজিজুল পারভেজ নন, ঐতিহ্যবাহী এ বিদ্যালয়ের প্রতিটি প্রাক্তন শিক্ষার্থীর হৃদয়ে শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত জলঢুপ উচ্চ বিদ্যালয়কে ঘিরে রয়েছে একই রকম আবেগ। দীর্ঘ ইতিহাস, আধুনিক অবকাঠামো, মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ ও আইসিটি ল্যাব থাকার পরও অভিভাবকদের অসচেতনতা, শিক্ষক সংকট এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় অনাগ্রহে বর্তমানে নানা সংকটের মুখে পড়েছে ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যাপীঠ।

বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক মুছব্বির আলীর কণ্ঠেও ফুটে উঠেছে হতাশার সুর। তার ভাষ্য, শিক্ষকরা আন্তরিকভাবে পরিশ্রম করলেও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। দিন দিন পাঠগ্রহণে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও মনোযোগ কমছে।

গৌরবের দীর্ঘ ইতিহাস

১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত জলঢুপ উচ্চ বিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি মেধা ও মনন বিকাশের এক অনন্য প্রতিষ্ঠান। প্রায় নয় দশকের পথচলায় এ বিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছেন অসংখ্য কৃতী ও প্রথিতযশা ব্যক্তি।

বিদ্যালয়ের চিরচেনা করিডোর, নির্মল প্রকৃতি, কমলা-আনারসের ঘ্রাণ, বিশাল খেলার মাঠ এবং গাছতলার স্মৃতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শিক্ষার্থীদের মনে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।

বিদ্যালয়ের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই মেধা ও ফলাফলের দিক থেকে এটি এলাকার অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছে।

অবকাঠামো আছে, শিক্ষক সংকটও রয়েছে

বর্তমানে বিদ্যালয়ে প্রায় সাড়ে ৫০০ শিক্ষার্থী রয়েছে। এসব শিক্ষার্থীর পাঠদানের জন্য প্রয়োজন প্রায় ২০ জন শিক্ষক। কিন্তু সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ বর্তমানে পাঁচটি পদ শূন্য রয়েছে।

বিশেষ করে ইংরেজি, শারীরিক শিক্ষা ও বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষক সংকট রয়েছে। ফলে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় পাঠদানে কিছুটা চাপ তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তবে বিদ্যালয়ে বর্তমানে বড় ধরনের ভবন সংকট নেই। রয়েছে বেশ কয়েকটি পরিপাটি ভবন, সুসজ্জিত শিক্ষক মিলনায়তন, প্রধান শিক্ষকের কক্ষ ও প্রয়োজনীয় অফিস কক্ষ। প্রতিটি ফ্লোরে রয়েছে পৃথক ওয়াশরুম। আধুনিক আইসিটি ল্যাব ও মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষও রয়েছে।

তবে বিদ্যালয়ের লাইব্রেরির অবস্থা তুলনামূলক ভালো নয় বলে জানা গেছে।

ফলাফলেও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ

একসময় পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলে সুনাম থাকা জলঢুপ উচ্চ বিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ফলাফল নিয়ে সন্তুষ্ট নন স্থানীয়রা।

২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয়টির ৭১ শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে। এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালেও পাশের হার আরও কম ছিল।

অভিভাবকদের অনেকে মনে করছেন, অতীত ঐতিহ্যের তুলনায় বর্তমান পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল প্রত্যাশিত নয়। কাগজে-কলমে ফলাফল মোটামুটি ভালো হলেও শ্রেণিকক্ষে গুণগত পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

‘শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সেই সম্পর্ক এখন আর নেই’

জলঢুপ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় আগ্রহ কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন স্থানীয় ইউপি সদস্য ও বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী সাদিকুর রহমান খান

তিনি বলেন, “আমাদের সময়ে শিক্ষকদের সঙ্গে ছাত্রদের আত্মিক সম্পর্ক ছিল। শিক্ষকরা নাম ধরে চিনতেন। এখন ছাত্র-শিক্ষকদের সেই অম্ল-মধুর সম্পর্কটা আর নেই।”

তার মতে, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় আগ্রহ বাড়াতে শিক্ষক, অভিভাবক ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

প্রধান শিক্ষকের কণ্ঠে হতাশা

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুছব্বির আলী বলেন, “আমরা শিক্ষকরা পরিশ্রম করি ঠিকই, কিন্তু ছাত্রদের কাছ থেকে যে আউটপুট আমরা আশা করি, সেটা কম পাচ্ছি। এই সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে হয়ে আসছে। শিক্ষার্থীরা এখন পাঠে কম মনোযোগী।”

তিনি আরও বলেন, এখানকার অনেক অভিভাবকও সন্তানদের পড়াশোনা নিয়ে আগের মতো সচেতন নন।

প্রধান শিক্ষক দাবি করেন, “ক্লাসে শিক্ষকরা যথেষ্ট মানসম্পন্ন পাঠদান করেন এবং তা কড়া নজরদারিতে রাখা হয়।”

খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চায় ভাটা

শিক্ষার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও জলঢুপ উচ্চ বিদ্যালয়ের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস।

ক্রিকেট ও ফুটবল প্রতিযোগিতায় বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অতীতে বহু ট্রফি ও সম্মান অর্জন করেছে। জাতীয় স্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতা এবং বিজ্ঞান মেলাতেও এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য।

তবে বর্তমানে সাংস্কৃতিক চর্চা উদ্বেগজনকভাবে কমে গেছে। খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে আগের সেই প্রাণচাঞ্চল্য আর নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রাক্তনদের হৃদয়ে আজও জলঢুপ

বর্তমান সংকটের মধ্যেও জলঢুপ উচ্চ বিদ্যালয়কে ঘিরে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের আবেগে কোনো ভাটা নেই। দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের কাছে বিদ্যালয়টি এখনো শৈশবের সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতির জায়গা।

তাদের কাছে জলঢুপ উচ্চ বিদ্যালয় শুধু ইট-পাথরের একটি ভবন নয়—এটি তাদের বেড়ে ওঠার জায়গা, স্বপ্ন দেখার জায়গা, জীবনের ভিত্তি গড়ে দেওয়ার জায়গা।

গৌরবোজ্জ্বল অতীত, প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য আর হাজারো কৃতী শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখরিত এই বিদ্যালয়টি যেন মহাকালের এক নীরব সাক্ষী।

তবে ঐতিহ্যের এই ধারাকে আগামী প্রজন্মের কাছে এগিয়ে নিতে হলে শিক্ষক সংকট নিরসন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়ানো, অভিভাবকদের সচেতন করা এবং সাংস্কৃতিক ও সহশিক্ষা কার্যক্রমকে আরও সক্রিয় করার ওপর জোর দিতে হবে। তাহলেই ১৯৩৫ সালে জ্বালানো শিক্ষার সেই প্রদীপ নতুন প্রজন্মের হাত ধরে আরও বহু বছর আলোকিত করবে জলঢুপ ও আশপাশের জনপদ।