বিয়ানীবাজারে নৌকাবাইচ নিয়ে ধূম্রজাল, মুখোমুখি তৌহিদী জনতা ও আয়োজকরা

    ‍স্টাফ রিপোর্টার
  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Aug 22, 2026 ইং 66 বার পঠিত
ছবির ক্যাপশন:
ad728


সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার সুনাই নদীতে আগামী ২৮ আগস্ট অনুষ্ঠেয় ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা নিয়ে দেখা দিয়েছে উত্তেজনা। ‘তৌহিদী জনতা’ নামের একটি পক্ষ প্রতিযোগিতা বন্ধের দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে আয়োজকরা বলছেন, দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও স্থানীয় মানুষের বিনোদনের অংশ হিসেবে নির্ধারিত সময়েই নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হবে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পক্ষে-বিপক্ষে চলছে নানা আলোচনা ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।অনেকে আশঙ্কা করছেন, মতবিরোধকে কেন্দ্র করে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, লাউতা ইউনিয়নের লাউতা ও বাহাদুরপুর যুব সমাজের উদ্যোগে প্রতি বছরের মতো এবারও সুনাই নদীতে বার্ষিক নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। আগামী ২৮ আগস্ট প্রতিযোগিতাটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে প্রতিবছর এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হলেও এবারই প্রথম তা নিয়ে প্রকাশ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা বন্ধের দাবিতে বিভিন্ন পোস্ট দেওয়া হচ্ছে। অপরদিকে আয়োজকদের পক্ষ থেকেও ঐতিহ্যবাহী এ আয়োজন চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে অবস্থান জানানো হচ্ছে। এতে এলাকায় এক ধরনের উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে লাউতা ইউনিয়নের গাংপাড় এলাকার এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘স্থানীয় যুবকেরা দীর্ঘদিন ধরে সুনাই নদীতে নৌকাবাইচের আয়োজন করে আসছেন। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ নদীর দুই তীরে দাঁড়িয়ে এ প্রতিযোগিতা উপভোগ করেন। কিন্তু কয়েক দিন ধরে কয়েকজন যুবক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নৌকাবাইচের বিরুদ্ধে লেখালেখি করছেন। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় আলোচনা ও উত্তেজনা বাড়ছে।’

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘নৌকাবাইচ এ এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের আনন্দ ও ঐতিহ্যের অংশ। প্রতিবছর শত শত মানুষ এ আয়োজন দেখতে আসেন। হঠাৎ করে এ নিয়ে বিরোধ তৈরি হওয়ায় আমরা চিন্তিত। বিষয়টি যেন কোনোভাবেই সংঘাতের দিকে না যায়, সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।’

এদিকে গত বৃহস্পতিবার বারিগ্রাম বাজার মসজিদে ‘তৌহিদী জনতা লাউতা ইউনিয়ন’-এর উদ্যোগে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা থেকে ২৮ আগস্টের নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে আয়োজক পক্ষের দাবি, নৌকাবাইচ বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের একটি অংশ। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় যুব সমাজের উদ্যোগে এ আয়োজন হয়ে আসছে। তাই হঠাৎ করে এ আয়োজন বন্ধের দাবি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।


বিষয়টি নিয়ে বিয়ানীবাজার উপজেলা প্রশাসনও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে হাবিবা মজুমদার বলেন, ‘নৌকাবাইচ আয়োজক কমিটি কিংবা যারা এর বিরোধিতা করছেন—কোনো পক্ষই আমাদের কাছে বিষয়টি নিয়ে লিখিতভাবে জানায়নি। আমরা খবর পেয়ে নিজেরাই বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছি। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানকে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। বিকেলে এলাকার লোকজন সভায় বসবেন। আশা করছি, বিষয়টি সমাধান হয়ে যাবে।’

তিনি বলেন, ‘এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ধর্মীয়ভাবে কোনো ধরনের উসকানি দেওয়া হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

বিয়ানীবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু জাফর মোহাম্মদ মাহফুজুল করিম বলেন, ‘বিষয়টি বিট কর্মকর্তার মাধ্যমে শুনেছি। সেখানে দুটি পক্ষ রয়েছে। আমরা বলে দিয়েছি, জেলা প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া কোনো নৌকাবাইচ হবে না। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

লাউতা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান গউস উদ্দিন বলেন, ‘পরিস্থিতি যাতে উত্তেজনাকর না হয়, সে জন্য উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি সুরাহার চেষ্টা চলছে।’

লাউতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘ফেসবুকে নৌকাবাইচের পক্ষে-বিপক্ষে লেখালেখি হচ্ছে। এর বাইরে আমার কিছু জানা নেই।’

এদিকে নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধ দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হবে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের। তাদের মতে, মতপার্থক্য থাকলেও কোনো পক্ষের উসকানিমূলক বক্তব্য বা কর্মকাণ্ডে যেন পরিস্থিতি উত্তপ্ত না হয়, সেদিকে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

তবে নৌকাবাইচ আয়োজন নিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন আয়োজক কমিটির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘নৌকাবাইচ যথাসময়ে হবে। প্রস্তুতির বিষয়ে গতকাল (শুক্রবার) আমরা মিটিং করেছি, আজও (শনিবার) সন্ধ্যার দিকে আরেকটা মিটিং আছে। নৌকাবাইচ হচ্ছে।’

আয়োজকদের এমন বক্তব্যের পর আগামী ২৮ আগস্ট নির্ধারিত নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে কি না, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগের দিকেও তাকিয়ে রয়েছেন স্থানীয়রা।