বিয়ানীবাজার উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা-কুশিয়ারা ও সোনাই নদী। একসময় ভোর হলেই নৌকা নিয়ে এসব নদীতে নামতেন জেলেরা। জাল ফেললেই উঠত টেংরা, বোয়াল, পাবদা, শিং, পুঁটিসহ নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ। সেই মাছ বিক্রির আয়েই চলত সংসার ও সন্তানদের পড়াশোনা।
এখন সারাদিন জাল ফেলেও অনেক সময় এক কেজি মাছও মিলছে না। মাছের সংকটে আয় হারিয়ে পূর্বপুরুষের পেশা বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন বিয়ানীবাজারের নদীপাড়ের জেলেরা।
উপজেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় নিবন্ধিত জেলে পরিবারের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। তাদের বেশ কয়েকটি সমিতি আছে।
স্থানীয় জেলেরা জানান, আগের মতো মাছ না পাওয়ায় নদীতে যাওয়ার খরচও উঠছে না। নৌকার জ্বালানি, জাল মেরামতসহ অন্যান্য খরচ বাদ দিলে হাতে থাকে সামান্যই। ফলে অনেকে নদীতে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। কেউ দিনমজুরি, কেউ কৃষিশ্রমিক, কেউ ইটভাটায় কাজ করছেন। আবার কেউ অটোরিকশা চালিয়ে বা অন্যের পুকুরে মাছ ধরে সংসার চালাচ্ছেন।
বৈরাগীবাজার এলাকার জেলে আব্দুল জলিল বলেন, “নদীতে মাছ নেই বললেই চলে। আগে মাছ ধরেই ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখা চালিয়েছি। এখন অন্যের জমিতে কাজ করতে হয়। ” জেলে শাহাদাত বলেন, “নদীতে মাছ পর্যাপ্ত না থাকায় মাঝেমধ্যে পুকুরের মাছ ধরার ডাক আসে। সেখানে সামান্য কিছু টাকা পাই। কিন্তু তা দিয়ে সংসারের খরচ ঠিকমতো চলে না।”
লাসা্ইতলা গ্রামের স্বপন নামের আরেক জেলে বলেন, “পেশা বদল করেছি ঠিকই, কিন্তু সারা বছর কাজ থাকে না। আয় কমে যাওয়ায় পরিবার নিয়ে কষ্টে দিন কাটছে।”
জেলেদের ভাষ্য, সুরমা-কুশিয়ারা ও সোনাই নদীতে বালু-পলি জমে নাব্যতা কমেছে। বিভিন্ন স্থানে চর জেগে ওঠায় পানির প্রবাহ ও মাছের বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে নদীর বড় অংশ বালুচরে পরিণত হওয়ায় মাছের স্বাভাবিক চলাচল ও প্রজননও ব্যাহত হচ্ছে।
বিয়ানীবাজার উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ইমতিয়াজ আহমদ বলেন, “নদী দূষণ, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া এবং জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তনের কারণে মাছের প্রজননের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও পরিবেশ কমে যাচ্ছে। ফলে মাছের উৎপাদনও কমছে। এর প্রভাব পড়ছে জেলেদের ওপর; তাদের জালে আগের তুলনায় মাছ কম ধরা পড়ছে।”
মাছ কমে যাওয়ায় শুধু জেলেদের আয়-রোজগারই কমেনি, সংকটে পড়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই পেশাও।
স্থানীয় অনেকের দাবি, বিয়ানীবাজারের প্রধান তিন নদী সুরমা-কুশিয়ারা ও সোনাই নদীর পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, মাছের প্রজনন ও বিচরণের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং নদীনির্ভর জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা জরুরি।