নানকার বিদ্রোহ: রক্তের বিনিময়ে অর্জিত কৃষকের অধিকার ও জাতীয় স্বীকৃতির দাবি

    অতিথি লেখক : মোঃ আনিসুর রহমান
  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Aug 18, 2026 ইং 64 বার পঠিত
ছবির ক্যাপশন:
ad728


এক ঐতিহাসিক রক্তক্ষয়ী অধিকার আদায়ের সংগ্রামের নাম নানকার কৃষক বিদ্রোহ। ব্রিটিশ আমলে নান বা রুটির বিনিময়ে যারা জমিদারদের অধীনে গোলামসদৃশ জীবনযাপন করতে বাধ্য হতেন, তাদের ‘নানকার’ বলা হতো। নানকার প্রথার মাধ্যমে তৎকালীন জমিদারেরা কৃষকদের ওপর নির্মম শোষণ চালাতেন। কৃষকের শ্রম, খাদ্য-শস্য ও ন্যায্য অধিকার কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি তাদের ওপর নানা ধরনের নির্যাতন চালানো হতো। এমনকি কৃষকের পরিবার ও নারীরাও জমিদারি শোষণ ও নিপীড়নের শিকার হতেন।

নানকার প্রথা বিলোপ, কৃষকের জমির অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং জমিদারি শোষণের বিরুদ্ধে সিলেট অঞ্চলে তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে কৃষকেরা গড়ে তুলেছিলেন এক দুর্বার আন্দোলন। এই আন্দোলন ক্রমেই বিস্তৃত ও তীব্র হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে জমিদারদের স্বার্থ রক্ষায় প্রশাসনের দমন-পীড়নও শুরু হয়।

১৯৪৯ সালের ১৮ আগস্ট সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার থানার তিলপাড়া ইউনিয়নের সানেশ্বর ও উলুউরি গ্রামের মধ্যবর্তী সুনাই নদীর তীরে আন্দোলনরত কৃষকদের ওপর পুলিশ, ইপিআর এবং জমিদারদের পেটোয়া বাহিনী গুলিবর্ষণ করে। নির্মম সেই হত্যাকাণ্ডে শহীদ হন ব্রজনাথ দাস (৫০), কটুমনি দাস (৪৭), প্রসন্ন কুমার দাস (৫০), পবিত্র কুমার দাস (৪৫) ও অমূল্য কুমার দাস (১৭)।

এর মাত্র ১৫ দিন আগে সুনাই নদীতে জমিদারের পোষ্যদের লাঠির আঘাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন কৃষক রজনী দাস। নানকার আন্দোলনের এই শহীদদের রক্ত কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে আরও বেগবান করে।

এই দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৫০ সালে তৎকালীন সরকার জমিদারি প্রথা বিলোপ করে এবং কৃষকদের জমির মালিকানার স্বীকৃতি দেওয়ার পথ তৈরি করে। ফলে নানকার বিদ্রোহ কেবল একটি আঞ্চলিক কৃষক আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল জমিদারি শোষণ ও সামন্ততান্ত্রিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সংগ্রাম।

শহীদ কৃষকদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রতি বছর ১৮ আগস্ট ‘নানকার বিদ্রোহ দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং এলাকাবাসী। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, নানকার বিদ্রোহের প্রায় ৭৭ বছর পরও এই ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলন রাষ্ট্রীয়ভাবে যথাযথ জাতীয় স্বীকৃতি পায়নি।

নানকার বিদ্রোহ বাংলাদেশের কৃষকসমাজের অধিকার আদায়ের ইতিহাসের একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। এই আন্দোলনের গৌরব, বেদনা ও রক্তাক্ত ইতিহাস নিপুণভাবে তুলে ধরা হয়েছে অজয় ভট্টাচার্য রচিত ‘নানকার বিদ্রোহ’ গ্রন্থে। এ ছাড়া এই ঐতিহাসিক আন্দোলনের সাক্ষী হিসেবে আজও আমাদের মধ্যে রয়েছেন ইতিহাসসচেতন অনেক গুণীজন এবং মুক্তিযুদ্ধের গবেষক ও লেখক তাজুল মোহাম্মদ।

নানকার বিদ্রোহের ইতিহাস শুধু সিলেটের ইতিহাস নয়—এটি বাংলাদেশের কৃষকের অধিকার আদায়ের ইতিহাস, শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের ইতিহাস। তাই এই মহান আন্দোলনের শহীদদের যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়া এবং নানকার বিদ্রোহকে জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

আমরা মনে করি, ১৮ আগস্টকে জাতীয়ভাবে ‘নানকার বিদ্রোহ দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ‘জাতীয় শোষণমুক্তি দিবস’ হিসেবে স্মরণ করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন নানকার বিদ্রোহের শহীদদের প্রতি জাতির শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে, অন্যদিকে নতুন প্রজন্ম বাংলাদেশের কৃষক ও মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে।

নানকার বিদ্রোহের শহীদদের রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না। তাঁদের আত্মত্যাগ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—অন্যায়, শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে মানুষের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামই অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করে।

নানকার বিদ্রোহের জাতীয় স্বীকৃতি এখন সময়ের দাবি।

অতিথি লেখক : মোঃ আনিসুর রহমান
সাধারণ সম্পাদক,বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) বিয়ানীবাজার উপজেলা কমিটি।