চ্যাট লোড হচ্ছে...

বিয়ানীবাজারে মাদ্রাসা শিক্ষায় তদারকির ঘাটতি, বাড়ছে উদ্বেগ

    ষ্টাফ রিপোর্টারঃ
  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 26, 2026 ইং 48 বার পঠিত
ছবির ক্যাপশন:
ad728

সিলেটের বিয়ানীবাজারে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় তদারকি ও জবাবদিহিতার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। উপজেলার হাফিজিয়া, আলিয়া ও কওমি ধারার বিভিন্ন মাদ্রাসায় নিয়মিত তদারকি, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং কিছু ক্ষেত্রে যৌন নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ্যে আসায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কার্যকর তদারকি, শিশু সুরক্ষানীতি বাস্তবায়ন এবং অভিযোগের যথাযথ তদন্ত ও প্রতিকারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি অভিভাবকদের আস্থা আরও কমতে পারে।

বিয়ানীবাজার উপজেলায় হাফিজিয়া, আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা সম্পর্কে স্থানীয় মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস কিংবা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দপ্তরে সমন্বিত তথ্য নেই বলে জানা গেছে। তবে স্থানীয়ভাবে মাদ্রাসার সংখ্যা বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছে। এ সংখ্যার স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।

দেশের বিভিন্ন স্থানে মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের নির্যাতন ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের ঘটনা সামনে আসায় বিয়ানীবাজারের প্রতিষ্ঠানগুলোর তদারকি ও শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থাও আলোচনায় এসেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আলিয়া মাদ্রাসাগুলো শিক্ষা বোর্ড ও সরকারি তদারকি কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হলেও কওমি মাদ্রাসাগুলো সাধারণত নিজস্ব বোর্ড ও ব্যবস্থাপনা কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হয়। হাফিজিয়া মাদ্রাসার ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানভেদে পরিচালনা ও তদারকির ব্যবস্থায় ভিন্নতা রয়েছে। ফলে অভিযোগের তদন্ত, শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ায় সব প্রতিষ্ঠানে একই ধরনের কাঠামো কার্যকর নয় বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু কওমি ও হাফিজিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী ভর্তি, অর্থায়ন, শিক্ষক নিয়োগ এবং শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনায় গৃহীত ব্যবস্থার তথ্য সহজে পাওয়া যায় না। প্রত্যন্ত অঞ্চলের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে সিসিটিভি ক্যামেরা ও লিখিত শিশু সুরক্ষানীতির ঘাটতি রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

পঞ্চখণ্ড হরগোবিন্দ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক মাওলানা হুমায়ুন রশীদ জাইদীর মতে, যথাযথ তদারকি ও জবাবদিহিতা না থাকলে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা আড়াল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এ কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা এবং শিক্ষার্থীদের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

শ্রীধরা গ্রামের হযরত সৈয়দ শাহ (রহ.) হাফিজিয়া মাদ্রাসার সেক্রেটারি আমিনুল হক দিলু বলেন, কিছু মাদ্রাসার হিফজখানায় শাসনের নামে অতিরিক্ত শারীরিক শাস্তি, বেত্রাঘাত ও নির্যাতনের চিত্র প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যায়। এ ধরনের ঘটনা মাদ্রাসা শিক্ষার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে।

সারোপার হাফিজিয়া মাদ্রাসার সাবেক সুপার ফয়জুল হক শিমুল বলেন, পর্যাপ্ত একাডেমিক প্রশিক্ষণ, শিশু মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে জ্ঞান এবং আধুনিক নেতৃত্বদানের দক্ষতার অভাবে কিছু শিক্ষক শিক্ষার্থীদের মানবিক উপায়ে পরিচালনা করতে পারেন না। এর নেতিবাচক প্রভাব পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ওপর পড়তে পারে।

শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শিক্ষার্থীদের ভুল সংশোধন ও শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে শারীরিক শাস্তি কিংবা অপমানের পরিবর্তে সহনশীলতা, ইতিবাচক আচরণ এবং বয়সোপযোগী শিক্ষাপদ্ধতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

বিয়ানীবাজার উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মৌলুদুর রহমান বলেন, কিছু আবাসিক মাদ্রাসায় শিক্ষকদের দ্বারা শিক্ষার্থীদের হয়রানি এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ও মামলা সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় অভিভাবক ও স্থানীয় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ, ভীতি এবং আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে। এর প্রভাব স্থানীয়ভাবে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার ক্ষেত্রেও পড়তে পারে।

তবে উপজেলায় মাদ্রাসার শিক্ষার্থী কমার প্রকৃত হার কিংবা এর পেছনে নির্দিষ্ট কারণগুলোর বিষয়ে সমন্বিত পরিসংখ্যান পাওয়া গেলে পরিস্থিতি আরও স্পষ্টভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ও শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে নিয়মিত পরিদর্শন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা এবং শিশু সুরক্ষানীতি বাস্তবায়ন জরুরি। প্রয়োজন অনুযায়ী শ্রেণিকক্ষ, আবাসন ও সাধারণ চলাচলের স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা যেতে পারে। তবে ক্যামেরা স্থাপনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের গোপনীয়তা রক্ষা এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

তাদের মতে, শিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক শাস্তি, মানসিক নির্যাতন ও যৌন হয়রানির অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ সুযোগ, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও অর্থায়নে স্বচ্ছতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষ, প্রশাসন ও অভিভাবকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের মতে, ধর্মীয় শিক্ষার পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রেখেই শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।