১০০ শয্যার হাসপাতালে ১৪৯ রোগী, আইসিইউ না পেয়ে মেঝেতেই শ্বাসকষ্টের শিশুর চিকিৎসা
সিলেটে হাম পরিস্থিতি আর শুধু সংক্রমণের পরিসংখ্যান নয়, হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে থাকা অসুস্থ শিশু আর উৎকণ্ঠায় রাত কাটানো স্বজনদের বাস্তবতায় তা এখন এক গভীর স্বাস্থ্য সংকটের চেহারা নিয়েছে। একদিকে বাড়ছে আক্রান্ত ও সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা, অন্যদিকে রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতালগুলো। কোথাও শয্যা নেই, কোথাও এক শয্যায় একাধিক রোগী, আবার গুরুতর অসুস্থ শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় আইসিইউ শয্যাও মিলছে না।
গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হাম রোগে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে সিলেট বিভাগে হাম ও রুবেলা রোগে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫৯ জনে। একই সময়ে নতুন করে ১৪৬ জন সন্দেহজনক হাম রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৪৫৭ জন।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত হাম ও রুবেলা রোগীর প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাব বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৩ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত বিভাগে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৪ জন। এর মধ্যে সিলেটে ৩৭৬, হবিগঞ্জে ১৫৩, মৌলভীবাজারে ১৫৮ এবং সুনামগঞ্জে ৩৫৭ জন।
কাগজের এই সংখ্যাগুলোই বাস্তবে কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠেছে, তার চিত্র পাওয়া যায় সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে। ১০০ শয্যার এই হাসপাতালে রোগী ভর্তি হয়েছেন ১৪৯ জন। অর্থাৎ হাসপাতালের নির্ধারিত সক্ষমতার তুলনায় রোগীর সংখ্যা প্রায় অর্ধশত বেশি। ফলে শয্যা না পেয়ে অনেক শিশুকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে মেঝেতে।
সোমবার দুপুরে হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে এমনই এক দৃশ্য দেখা যায়। ১০ মাস বয়সী অসুস্থ শিশুকে কোলে নিয়ে মেঝেতে শুয়ে ছিলেন গৃহিণী সুহাদা বেগম। শিশুটির শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তার আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন। কিন্তু হাসপাতালের আইসিইউতে কোনো শয্যা খালি নেই।
সুহাদা জানান, চার দিন আগে হাম সন্দেহে তাঁর চার মাস বয়সী জমজ দুই সন্তানকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষায় দুজনের শরীরেই হাম শনাক্ত হয়েছে। এর আগে জ্বর ও কাশি নিয়ে সন্তানদের গোয়াইনঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে দুই দিন চিকিৎসা নেওয়ার পরও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় চিকিৎসকের পরামর্শে তাঁদের সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে আনা হয়।
একই ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিতে থাকা বিয়ানীবাজারের আলীনগরের বাসিন্দা সুহেদা আক্তারের দুই সন্তানও শয্যা পায়নি। তাঁর বড় ছেলের বয়স চার বছর দুই মাস। হামের পাশাপাশি তার নিউমোনিয়াও ধরা পড়েছে। ছোট সন্তানের বয়স ১৮ মাস। তারও হামসহ অন্য রোগ রয়েছে। তিন দিন ধরে দুই সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে অবস্থান করছেন তিনি। শয্যা না থাকায় মেঝেতেই চলছে দুই শিশুর চিকিৎসা।
সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের বাসিন্দা শেফালীর তিন বছর বয়সী ছেলেকেও তিন দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট নিয়ে সন্তানকে হাসপাতালে এনেছিলেন তিনি। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, ধীরে ধীরে তার অবস্থার উন্নতি হচ্ছে।
সোমবার শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, শয্যার সংকটে অসুস্থ শিশুদের নিয়ে মেঝেতে গাদাগাদি করে বসে আছেন মায়েরা। অনেক শিশুর ঠিকমতো শুয়ে থাকারও জায়গা নেই। একটি শয্যায় একাধিক রোগীকেও চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে। ওয়ার্ডজুড়ে শিশুদের কান্না, স্বজনদের উৎকণ্ঠা আর চিকিৎসকদের ব্যস্ততায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে রোগীর চাপের মাত্রা।
হাম ওয়ার্ডে ভর্তি অধিকাংশ শিশুর বয়স দুই বছরের কম। কারও এখনো টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি, কেউ টিকা নেয়নি, আবার কেউ নিয়েছে মাত্র এক ডোজ। এমনকি দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও হামের উপসর্গ নিয়ে কোনো কোনো শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি হতে দেখা গেছে। ফলে টিকাদানের উচ্চ কভারেজের পরও সংক্রমণের উৎস, বাদ পড়া শিশু এবং টিকার আওতার বাইরে থাকা বয়সী শিশুদের নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. খসরুজ্জামান রনি বলেন, শুধু শিশুরাই নয়, বড়রাও হামে আক্রান্ত হচ্ছেন। পরিস্থিতির এখনো কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। সোমবার হাম সন্দেহে ৪৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সব মিলিয়ে ১০০ শয্যার বিপরীতে রোগী ভর্তি রয়েছেন ১৪৯ জন। রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসা দিতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে।
সিলেট বিভাগের সংকট অবশ্য একটি হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ নেই। স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১৪৬ জনের মধ্যে ৪৯ জন সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে, ৪৬ জন ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, ২ জন মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে, ৫ জন রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং ৪ জন নর্থ ইস্ট হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ ছাড়া গোলাপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৯ জন, মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে ১৯ জন, সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ৯ জন এবং জামালগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩ জন ভর্তি হয়েছেন।
অথচ গত ২০ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত দেশব্যাপী ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন চালানো হয়েছে। সিলেট বিভাগে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯৯ দশমিক ৪০ শতাংশ শিশুকে টিকা দেওয়ার দাবি করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। চার জেলা ও সিলেট সিটি করপোরেশনে ১৩ লাখ ২৩ হাজার ৯৬৬ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে টিকা পেয়েছে ১৩ লাখ ১৬ হাজার ৩১ জন। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৭ হাজার ৯৩৫ জন কম শিশু টিকা পেয়েছে।
সুনামগঞ্জে টিকাদানের হার ৯৯ দশমিক ৭৬ শতাংশ, হবিগঞ্জে ৯৯ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং সিলেট জেলায় ৯৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ। মৌলভীবাজারে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। সেখানে কভারেজ হয়েছে ১০০ দশমিক ২১ শতাংশ। সিলেট সিটি করপোরেশনেও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে সামান্য বেশি টিকা দেওয়া হয়েছে; কভারেজ ১০০ দশমিক ১ শতাংশ।
টিকাদানের এমন উচ্চ কভারেজের পরও যখন হাম রোগীর সংখ্যা বাড়ছে এবং হাসপাতালের মেঝেতে জায়গা করে নিতে হচ্ছে শিশুদের, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—ক্যাম্পেইনের বাইরে থাকা বা বাদ পড়া শিশুরা কোথায়, তাদের শনাক্তকরণ কতটা কার্যকর, আর আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালগুলো কতটা প্রস্তুত?
সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, হাম একটি সংক্রামক রোগ। সাম্প্রতিক সময়ে এর প্রাদুর্ভাব ও রোগীর সংখ্যা কিছুটা বাড়ছে। টিকাদানের উপযুক্ত বয়স ও বয়সসীমার পার্থক্যের কারণে অনেক শিশু সময়মতো টিকা না পাওয়ায় সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। বর্তমানে স্ক্রিনিং করে বাদ পড়া শিশুদের চিহ্নিত করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সম্প্রতি সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, চলতি সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে দেশব্যাপী হামের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হবে। অসচেতনতা ও তথ্যের অভাবে অনেক শিশু টিকা থেকে বাদ পড়েছে বলেও জানান তিনি।
কিন্তু নতুন করে টিকা দেওয়ার উদ্যোগের পাশাপাশি প্রশ্নটি থেকে যাচ্ছে চিকিৎসা ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে। কারণ সংক্রমণ হলে শিশুকে হাসপাতালে নিতে হচ্ছে, অথচ হাসপাতালে পর্যাপ্ত শয্যা নেই। গুরুতর অসুস্থ শিশুর আইসিইউ প্রয়োজন হলেও আইসিইউ শয্যা খালি নেই। ১০০ শয্যার হাসপাতালে যখন ১৪৯ জন রোগী ভর্তি থাকেন, তখন শুধু রোগীর সংখ্যা নয়, স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রস্তুতির ঘাটতিও চোখে পড়ে।
হাম নিয়ন্ত্রণে টিকা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু টিকা নেওয়ার পরও যারা আক্রান্ত হচ্ছে কিংবা যাদের এখনো টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি, তাদের চিকিৎসার দায়ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার। তাই শুধু টিকাদানের সাফল্যের পরিসংখ্যান প্রকাশ করলেই চলবে না; একই সঙ্গে হাসপাতালের সক্ষমতা, অতিরিক্ত শয্যা, পর্যাপ্ত চিকিৎসক-নার্স, অক্সিজেন সরবরাহ এবং গুরুতর রোগীদের জন্য আইসিইউ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
সিলেটের হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে থাকা শিশুদের দিকে তাকালে সংকটটির গভীরতা বোঝা যায়। একটি মা যখন অসুস্থ শিশুকে কোলে নিয়ে আইসিইউর শয্যার অপেক্ষায় থাকেন, আর অন্য মা যখন শয্যা না পেয়ে মেঝেতেই সন্তানের চিকিৎসা করান, তখন ৯৯ শতাংশের বেশি টিকাদানের সাফল্যের পরিসংখ্যান তাঁদের দুর্ভোগ কমায় না।
হাম ঠেকাতে টিকা কর্মসূচি চলবে, বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করার উদ্যোগও চলবে। কিন্তু আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল যদি প্রস্তুত না থাকে, তাহলে প্রতিরোধের সাফল্যও শেষ পর্যন্ত এসে ঠেকবে চিকিৎসা সংকটে।
সিলেটের মেঝেতে চিকিৎসা নেওয়া শিশুরা যেন সেই সংকেতই দিচ্ছে—হাম মোকাবিলায় এখন শুধু টিকা নয়, হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানোরও জরুরি সময়।